শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

দ্যা প্রফেট: বন্ধুত্ব বিষয়ে - মুন আর ক্যামেলিয়া



বহুল আলোচিত কবি কাহলিল জিবরান তার The Prophet বইটিতে আধুনিক মানুষের চিত্তের অসুখের নিরাময় করতে চেয়েছেন। যেখানে মানব জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি ২৮টি স্তর নিয়ে বেশ খোলামেলাভাবে নিগুঢ় সত্য ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন । এর প্রথম অধ্যায়ের নাম ষড়াব এবং শেষ অধ্যায় দুটোর শিরোনাম উবধঃয এবং ঞযব ঋধৎববিষষ । এই লেখায় বইয়ের ঋৎরবহফংযরঢ় নামক অধ্যায় নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো।

বন্ধুত্ব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে কাহলিল জিবরান প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসের জায়গায় আঘাত করেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। প্রাথমিক ভাবে তিনি আলোচনা করেছেন বন্ধুত্বের মনঃস্তাত্বিক দিক ও মধ্যভাগে আলোচনা করেছেন বন্ধুত্বের স্বরুপ শেষ অংশে মতামত দিয়েছেন কেমন হওয়া উচিত বন্ধুত্বের সম্পর্কের রুপ।

শুরুতেই কবি বলেন, সে-ই তোমার বন্ধু , তোমার প্রয়োজনে যার কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাও । লেখক বন্ধুকে দেখিয়েছেন ফসলের মাঠের সাথে- যেখানে ভালবেসে বীজ বপন করি আর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে ফসল কেটে নিয়ে যাই। তিনি আরো বলেন, বন্ধু নিজেকে রক্ষা করার ঢাল। কোনো অজানা ক্ষুধা থেকে তার কাছে যাও, খুঁজে ফের একপ্রস্ত প্রশান্তি। বন্ধু যখন হৃদয় থেকে কথা বলে সে কথায় নির্দিধায় ‘না’ বলা যায়। আবার মনের সম্মতি ও জানানো যায় অবলীলায়। বন্ধুরা যখন নীরব থাকে তখন কেউ একে অন্যের মনের কথা শোনা বন্ধ করে না। এর কারণ, শব্দ ছাড়াই বন্ধুত্বের মাঝে সকল ভাবনা, সকল প্রত্যাশা, সকল আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয় আবার তা ভাগাভাগি হয় স্বতস্ফুর্তভাবে, যেখানে কোনো প্রত্যাশা থাকে না। বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় লগ্নে শোকার্ত হওয়ার কিছু নেই, কারণ বন্ধুর যেই গুণটি তোমার পছন্দের তার অবর্তমানে তুমি তা আরো বেশি স্পষ্ট দেখতে পাবে।

শেষ পর্যায়ে এসে জিবরান নির্দেশনা দিয়েছেন আত্মাকে উন্নত করা ছাড়া বন্ধুত্বে যেন আর কোনো উদ্দেশ্য না থাকে। কারণ যে ভালবাসা হৃদয়-রহস্যের সত্য উন্মোচন ছাড়া অন্যকোনো বস্তু খোঁজে, সেখানে মুল্যহীন অপ্রয়োজনীয় বিষয়ই জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরো বলেন, তোমার সর্বোচ্চ ভাল যা কিছু আছে তা-ই তোমার বন্ধুর জন্য রাখো। তোমার হৃদয়ের দুঃসহ যন্ত্রনার খবর তাকে জানালে তোমার হৃদয়ের উচ্ছাস-জলোচ্ছাসের খবরও তাকে জানিও।

কাহলিল জিবরান প্রশ্ন রেখেছেন, তুমি তোমার বন্ধুকে কেন খোঁজো? তার সময়কে হত্যা করার জন্যই কি? বরং সময়কে অর্থবহ করে তোলার জন্যই তার সন্ধ্যান করো । বন্ধুর প্রয়োজন পূরণ করো, তোমার শূন্যতা বা অপ্রাপ্তি তাকে দিয়ে পূরণ কোরো না। হাসি আর আনন্দ  বিনিময়ের মাধ্যমে বন্ধুত্ব মধুর হোক।

লেখক- শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শীতার্ত কবিতাগুচ্ছ - ময়ুখ চৌধুরী





শীতগল্প

খুব বেশি কিছু নয়, একটি উড়ন্ত পাতা সামান্য আশ্রয় চেয়েছিল
এই শীতে বাঘের নিশীথে;
স্বঘোষিত পুরোনো সেবক, ঐ দ্যাখো,
তোমার আশ্বাসে ভর করে
বিক্ষত পাখির ডানা উড়ে আসছে বিছানাবালিশ

সারাদিন দানাপানিহীন
একটি শীতার্ত দেহ
যথার্থ ঘুমের স্বপ্নে নুয়ে পড়া, ভারি দুটি চোখ
কতো দূর থেকে এলো কপট বাক্যের মমতায়
নাওয়া নেই খাওয়া নেই মধ্যরাতে শীতের করাত
এমন বিপন্ন সত্তা, তার মুখে খাদ্য নয় গান পুঁতে দিলে
রাজার বাড়ির গান ছটফটে রাতের ক্ষুধায়

কোথাও অনেক দূরে গরম ভাতের ধোঁয়া কুয়াশায় মেশে
কোথায় গরম ভাত, কোথায় লেপতোশক রাজার বাড়িতে যায় উড়ে

পড়ে থাকে ফুটপাথে রাতের ক্ষুধায়
নিহিত বিশ্বাসটুকু কুয়াশার কাফনে জড়ানো
এই তো শীতের গল্প, ঋতুচক্র, দেনা আর দায়
আহত পাখির মতো ইতিহাস অন্ধকারে যায়


শীতার্ত পঙক্তিমালা

শীত এসে গেছে।
খড়কুটো জড়ো করে আগুনকে ডেকে বললাম
আগুনের কাছে গেলে আরো বেশী শীত করে কেন?

রেলগাড়ি চলে গেছে। ইস্টিশনে ধ্রুবতারা জ্বলে,-
টিনের চাদর, নিচে কুয়াশায় কেটে গেছে দুই যুগ শীত;
শেষের কবিতা শেষে আরও কাছে এসেছে অমিত।

শীত এসে গেছে। এই শীত একজনে ঠেকাতে পারবে না।
এ কথার কী কী অর্থ হয়?
এর উত্তর জানে শুধু ইতালির মেয়ে সিনোরিতা,
যাবার আগেই তাই ঝরেছিল অতিরিক্ত দুচারটি পাতা।

কে কাকে বলেছে এই কথা-
এইবার খুব বেশী শীত পড়তে পারে
কেননা, আগের মতো থাকবো না কাছে।

এসব প্রশ্নের ছায়া রয়ে গেছে, শরীর কোথায়?
শরীর বরফে গেছে, বরফ গিয়েছে আজ আগুনের কাছে,
এখানে উদ্বৃত্ত কিছু ছাই পড়ে আছে।


ঋতুচক্রান্ত

মেরুদেশে দেখা হয় না
      শাদা বরফের সঙ্গে কাল বরফের
      রূপালি রোদের সঙ্গে সোনালি জোৎস্নার
-আগে দেখা হতো
ভূগোলের নিয়মমাফিক
মানুষেরা কাঁটাতার দিয়ে
      আকাশের নীল ছাতা আলাদা করেছে

আজ
   আলাদা ছাতার নিচে
   দূরে দূরে
   জ্যোৎস্না আর রোদ,

অথচ
   আলাদা আলাদা দুটো মুঠোর ভিতর
                 একটাই শীত


শীতগাছ

আবার এসেছে শীত কুয়াশা জমাট বাঁধে শীতগাছে,
বোঁটা ছিঁড়ে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে শীত জলের আকারে
অন্ধকারে কেঁপে ওঠে পাতার বুকের তলে বউপাতা,
ক্রমান্বয়ে পাতাগুলো সিঁড়ি হয়ে নামে; আগুনের খোঁজে

চরণেরা নেমে আসে টুপটাপ টুপ,
ভৌতিক লণ্ঠন জ্বল্ব জেগে থাকা ঘড়-বাড়ি চুপ-
সেখানে রচিত হয় হৃতকম্প ব্যতিরেকে শীতার্ত কবিতা
প্রকৃত বিধানমতে সেও চলে যাবে

তবুও কোথাও যেন একদিন শীত এসেছিল,
শরণার্থী হতে চেয়েছিল
একটি শালের নিচে,
দুটি শীতগাছ তার সবগুলো ডালপালা মেলে
অক্টোপাস হতে চেয়েছিল

শীতকাল আজও আসে, যথারীতি যায়;
তার কার্যকলাপের তেমন ব্যত্যয় কিছু নেই,
তবু বারবার শীত কিছু একটা ফেলে রেখে আসে

অন্ধকার শীতের পরিপ্রেক্ষিতে

অন্ধকার নামছে
কালো একটা কোটের মতো
শীতের শরীরে

শীত নামছে
তোমার আবৃত বুকের
ধবধবে খোঁপার মতো
পাহাড়ের চূড়ায়

অতঃপর
অন্ধকার শীত নামছে
প্রকাণ্ড এক ভালুকের মতো
একটি ঘরে,
যেখানে তুমি আর আমি

এসো,
আমরা বিষুবরেখা খুঁজি


ছবি: সনি


মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

শহর - শরীফুল আলম। কবিতা





রাজহাঁসের দল ঠিকই একদিন শহর ছেড়ে গেলো
আমি এক নিঃসঙ্গ প্রেত, নিস্তেজ হয়ে ভাবি
টপ হ্যাটের ভিতর থেকে যে ম্যাজিশিয়ান
সাদা খরগোশ তুলে এনেছিলো বহু বছর আগে
যার সারা গায়ে মখমলের মতো লোম
আমরা টিকে আছি বস্তুত এই লোমের গভীরে
আমাদের গন্তব্য প্রতিদিনই বদলায়
যেন সদ্য জেগে ওঠা কোনো দূরবর্তী উপকূল...





তোমার জোড়া চুপচাপ ঠোঁট, বিষণ্ন মুখ
আমার বহু বছরের না সেরে ওঠা অসুখ
দেখবে একদিন
তোমার শূন্য চোখও
আমার অপেক্ষায় ধুলোর শহর পোহায়
রাতের শহরে সমস্ত হাইওয়ের ফুটপাত ধরে হেঁটে বেড়ায়।


তারপর ধরো,
কবরে ছেয়ে গেলো একদিন সমস্ত শহর-সমভূমি
বুড়ো রাজপথে নকশাকাটা কফিনের মিছিল
দাবি একটাই- তাদের ডানা চাই!
সাদা গোলাপের দাম বেড়ে গেলো পৃথিবীতে, হঠাৎ...
শুধু আমার শেষ প্রেমিকার এ্যাপ্রোনের পকেটে থাকবে
পৃথিবীর শেষ লাল গোলাপ
তার তর্জনীর নখে আমার শেষ রক্ত বিন্দু
সেই সাথে আমার জন্মান্তরের ভালোবাসা...



লেখক- শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

হুমায়ূন আহমেদের কিছু কবিতা


লীলাবতী  উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন:

শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ। কবি, আমি কখনো গদ্যকার হতে চাই নি। আমি আপনার মতো একজন হতে চেয়েছি। হায়, এত প্রতিভা আমাকে দেয়া হয় নি।

ঔপন্যাসিক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা বিষ্ময়কর। তাঁর উপন্যাস কমবেশি সবাই-ই পড়েছি আমরা। কিন্তু আমাদের অনেকেরই কাছে অপরিচিত রয়ে গেছে তাঁর কবি সত্ত্বাটি। সেই সত্ত্বাটি আসুন দেখে নেই একটুখানি_ তাঁর কয়েকটি কবিতা পড়ে। 


রাশান রোলেট

টেবিলের চারপাশে আমরা ছ'জন
চারজন চারদিকে ; দু'জন কোনাকুনি
দাবার বোড়ের মত
খেলা শুরু হলেই একজন আরেকজনকে খেয়ে ফেলতে উদ্যত ।
আমরা চারজন শান্ত, শুধু দু'জন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে ।
তাদের স্নায়ু টানটান।
বেড়ালের নখের মত তাদের হৃদয় থেকে
বেরিয়ে আসবে তীক্ষ্ম নখ ।
খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছে,
আম্পায়ার এখনো আসেনি।
খেলার সরঞ্জাম একটা ধবধবে সাদা পাতা
আর একটা কলম ।
কলমটা মিউজিক্যাল পিলো হাতে হাতে ঘুরবে
আমরা চারজন চারটা পদ লিখবো ।
শুধু যে দু'জন নখ বের করে কোনাকুনি বসে আছে
তারা কিছু লিখবে না ।
তারা তাদের নখ ধারালো করবে
লেখার মত সময় তাদের কোথায় ?
প্রথম কলম পেয়েছি আমি,
আম্পায়ার এসে গেছেন।
পিস্তল আকাশের দিকে তাক করে তিনি বললেন,
এ এক ভয়ংকর খেলা,
কবিতার রাশান রোলেট -
যিনি সবচে ভালো পদ লিখবেন
তাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলা হবে ।
আমার হাতে কলম কম্পমান
সবচে সুন্দর পদ এসে গেছে আমার মুঠোয়।

গৃহত্যাগী জোৎস্না

প্রতি পূর্নিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই
গৃহত্যাগী হবার মত জ্যোৎস্না কি উঠেছে ?
বালিকা ভুলানো জ্যোৎস্না নয়।
যে জ্যোৎস্নায় বালিকারা ছাদের রেলিং ধরে ছুটাছুটি করতে করতে বলবে-
ও মাগো, কি সুন্দর চাঁদ !
নবদম্পতির জ্যোৎস্নাও নয়।
যে জ্যোৎস্না দেখে স্বামী গাঢ় স্বরে স্ত্রীকে বলবেন-
দেখ দেখ নীতু চাঁদটা তোমার মুখের মতই সুন্দর !
কাজলা দিদির স্যাঁতস্যাতে জ্যোৎস্না নয়।
যে জ্যোৎস্না বাসি স্মৃতিপূর্ন ডাস্টবিন উল্টে দেয় আকাশে।
কবির জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্না দেখে কবি বলবেন-
কি আশ্চর্য রূপার থালার মত চাঁদ !
আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নার জন্য বসে আছি।
যে জ্যোৎস্না দেখামাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে-
ঘরের ভেতরে ঢুকে পরবে বিস্তৃত প্রান্তর।
প্রান্তরে হাঁটব, হাঁটব আর হাঁটব-
পূর্নিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে।
চারদিক থেকে বিবিধ কন্ঠ ডাকবে- আয় আয় আয়।

বাসর

কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে তার সঙ্গে দেখা ।
লোহার তৈরি ছোট্ট একটা ঘর ।
বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোন যোগ নেই ।
ঘরটা শুধু উঠছে আর নামছে ।
নামছে আর উঠছে ।
মানুষ ক্লান্ত হয় –
এ ঘরের কোন ক্লান্তি নেই।
এ রকম একটা ঘরেই বোধহয় বেহুলার বাসর হয়েছিল ।
নিশ্ছিদ্র লোহার একটা ঘর ।
কোন সাপ সেখানে ঢুকতে পারবে না ।
হিস হিস করে বলতে পারবে না, পাপ করো। পৃথিবীর সব আনন্দ পাপে ।
পুণ্য আনন্দহীন । উল্লাসহীন ।
পুণ্য করবে আকাশের ফিরিশতারা ।
কারণ পুণ্য করার জন্যেই তাদের তৈরি করা হয়েছে ।
লোহার সেই ঘরে ঢোকার জন্য সাপটা পথ খুঁজছিলো ।
সেই ফাঁকে বেহুলা তাঁর স্বামীকে বললেন, কি হয়েছে, তুমি ঘামছ কেন ?
আর তখন একটা সুতা সাপ ঢুকে গেলো।
ফিসফিস করে কোন একটা পরামর্শ দিতে গেলো ।
বেহুলা সেই পরামর্শ শুনলেন না বলেই কি লখিন্দরকে মরতে হল ?

তার সঙ্গে আমার দেখা কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে ।
ঘরটা শুধু ওঠে আর নামে ।
আমি তাকে বলতে গেলাম - আচ্ছা শুনুন, আপনার কি মনে হচ্ছে না
এই ঘরটা আসলে আমাদের বাসর ঘর ?
আপনি আর কেউ নন, আপনি বেহুলা ।
যেই আপনি ভালবেসে আমাকে কিছু বলতে যাবেন
ওম্নি একটা সুতা সাপ এসে আমাকে কামড়ে দেবে ।
আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন । দয়া করে কিছু বলবেন না ।

অশ্রু

আমার বন্ধুর বিয়ে
উপহার বগলে নিয়ে
আমি আর আতাহার,
মৌচাক মোড়ে এসে বাস থেকে নামলাম
দু’সেকেন্ড থামলাম।।
টিপটিপ ঝিপঝিপ
বৃষ্টি কি পড়ছে?
আকাশের অশ্রু ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে?

আমি আর আতাহার
বলুন কি করি আর?
উপহার বগলে নিয়ে আকাশের অশ্রু
সারা গায়ে মাখলাম।।
হি হি করে হাসলাম।।

কব্বর

তিনি শায়িত ছিলেন গাঢ় কব্বরে
যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেঁধে দেয়া,
গভীরতা নয়।
কব্বরে শুয়ে তাঁর হাত কাঁপে পা কাঁপে
গভীর বিস্ময়বোধ হয়।
মনে জাগে নানা সংশয়।
মৃত্যু তো এসে গেছে, শুয়ে আছে পাশে
তবু কেন কাটে না এ বেহুদা সংশয়?

বাবার চিঠি
আমি যাচ্ছি নাখালপাড়ায়।
আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে পাঠাচ্ছেন তাঁর
প্রথম প্রেমিকার কাছে।
আমার প্যান্টের পকেটে সাদা খামে মোড়া বাবার লেখা দীর্ঘ পত্র।
খুব যত্নে খামের উপর তিনি তাঁর প্রণয়িনীর নাম লিখেছেন।
কে জানে চিঠিতে কি লেখা - ?
তাঁর শরীরের সাম্প্রতিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা ?
রাতে ঘুম হচ্ছেনা, রক্তে সুগার বেড়ে গেছে
কষ্ট পাচ্ছেন হাঁপানিতে - এইসব হাবিজাবি। প্রেমিকার কাছে
লেখা চিঠি বয়সের ভারে প্রসঙ্গ পাল্টায়
অন্য রকম হয়ে যায়।
সেখানে জোছনার কথা থাকে না,
সাম্প্রতিক শ্বাসকষ্ট বড় হয়ে উঠে।
প্রেমিকাও একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর
রোগভুগের কথা পড়তে ভালবাসেন।
চিঠি পড়তে পড়তে দরদে গলিত হন –
আহা, বেচারা ইদানিং বড্ড কষ্ট পাচ্ছে তো ...

সংসার

শোন মিলি।
দুঃখ তার বিষমাখা তীরে তোকে
বিঁধে বারংবার।
তবুও নিশ্চিত জানি,একদিন হবে তোর
সোনার সংসার ।।
উঠোনে পড়বে এসে একফালি রোদ
তার পাশে শিশু গুটিকয়
তাহাদের ধুলোমাখা হাতে - ধরা দেবে
পৃথিবীর সকল বিস্ময়।

তিনি

এক জরাগ্রস্থ বৃদ্ধ ছিলেন নিজ মনে
আপন ভুবনে।
জরার কারণে তিনি পুরোপুরি বৃক্ষ এক।
বাতাসে বৃক্ষের পাতা কাঁপে
তাঁর কাঁপে হাতের আঙ্গুল।
বৃদ্ধের সহযাত্রী জবুথবু-
পা নেই,শুধু পায়ের স্মৃতি পড়ে আছে।
সেই স্মৃতি ঢাকা থাকে খয়েরি চাদরে।
জরাগ্রস্থ বৃদ্ধ ভাবে চাদরের রঙটা নীল হলে ভাল ছিল।
স্মৃতির রং সব সময় নীল।

কাচপোকা

একটা ঝকঝকে রঙিন কাচপোকা
হাঁটতে হাঁটতে এক ঝলক রোদের মধ্যে পড়ে গেল।
ঝিকমিকিয়ে উঠল তার নকশাকাটা লাল নীল সবুজ শরীর।
বিরক্ত হয়ে বলল,রোদ কেন?
আমি চাই অন্ধকার ।চির অন্ধকার
আমার ষোলটা পায়ে একটা ভারি শরীর বয়ে নিয়ে যাচ্ছি-
অন্ধকার দেখব বলে।
আমি চাই অন্ধকার ।চির অন্ধকার
একটা সময়ে এসে রোদ নিভে গেল
বাদুড়ে ডানায় ভর করে নামল আঁধার।
কি গাঢ়,পিচ্ছিল থকথকে অন্ধকার !
কাচপোকার ষোলটা ক্লান্ত পা বার বার
সেই পিচ্ছিল আঠালো অন্ধকারে ডেবে যাচ্ছিল।
তার খুব কষ্ট হচ্ছিল হাঁটতে
তবু সে হাঁটছে-
তাকে যেতে হবে আরও গভীর অন্ধকারে।
যে অন্ধকার-আলোর জন্মদাত্রী।

সংগ্রহ: হুইসেল সাহিত্যপত্র

বুধবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৯

১০ নভেম্বর আসছে রঁদেভূর ১৭তম সংখ্যা


রঁদেভূ মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের একটি শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সৃজনশীল প্রকাশনা । রঁদেভূ ফরাসি শব্দ, এর অর্থ মিলনমেলা। এটি ১৯৯৬ সাল থেকে অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। আগামী ১০ নভেম্বর মহান বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রঁদেভূর ১৭তম সংখ্যা , বিশেষ সংকলন ‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রয়াণ দিবস সংখ্যা-২০১৯’  প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

রঁদেভূর এবারের প্রকাশনায় একঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থীর বিভিন্ন লেখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক,  লেখক ও গবেষকগণের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গবেষণামূলক লেখাগুলো প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তরুণদের লেখা ও কবিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে, মহান বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার চিন্তা চেতনাসমূহ ছাত্র-যুব সমাজ কীভাবে গ্রহণ করছে সেটিও ফুটে উঠেছে।


রঁদেভূ প্রকাশনা পর্ষদ মনে করে, এই প্রকাশনাটির মাধ্যমে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীবৃন্দ, শিক্ষক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের কবি, সাহিত্যিক ও  সচেতন মানুষদের মধ্যে লেখার মাধ্যমে চিন্তার আদান-প্রদান হবে।  বর্তমান সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ছাত্র-যুব সমাজের ভাবনাসমূহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে দেয়ার লক্ষেই রঁদেভূ প্রকাশনা পর্ষদ কাজ করে থাকে।

বি.দ্র.  বইটি আগামী ১০ ই নভেম্বর’১৯ মহান বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র লারমার ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জুম্ম জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে মোড়ক উম্মোচন করা হবে। এবং এরপরই ম্যাগাজিনটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে।


রঁদেভূ’র ১৭তম সংখ্যাটির জন্য যোগাযোগ করুন:

ম্যাকলিন চাকমা
সম্পাদক
০১৫৫৮৯৮৪৫০০

রুমেন চাকমা
যুগ্ম সম্পাদক
০১৫৫৯৩৬১৭৯৯

রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ময়ুখ চৌধুরীর লেখা তিনটি কবিতা


কাটা পাহাড়


সাঁতার কাটবে বলে কোনো এক স্বরচিত নদী
পায়ে পায়ে একদিন পাহাড়ের কাছে এসেছিল।
পাহাড় দো-ফাঁক হয়ে রাস্তা করে দিয়েছিল তাকে।
হঠাৎ কী জানি হলো
নদীটা গুটিয়ে গেল শামুকের কঠিন খোলসে।
কাটা পাগাড়ের মাংস
কে দেবে সেলাই করে শুনি!

৪.৩.১২

(চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটা পাহাড় নামে একটি সড়ক আছে। এই কবিতাটি সে সড়ককে নিয়ে লেখা। সড়কটি পাহাড় কেটে বানানো হয়েছিল)


জিরো পয়েন্ট টু ইনফিনিটি


ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে
নীল তিমিমাছ ট্রেনের মতো,
যায় চলে যায় জারুলতলায়
গুনগুনিয়ে দেবব্রত।

ইস্টিসনের অল্প দূরে অন্যরকম তরী
জারুলতলায় তরুণ ছায়ায় থমকে গেছে ঘড়ি ।

হঠাৎ দেখা চন্দ্রলেখা
আসছে ছুটে সি-এন-জিতে
কী যেন কী নেয় নি ফেরত
খুঁজছে এখন বিশ্বজিতে ।

সঙ্গে তাহার সবুজ পাহাড়, নীলাম্বরী নীল যমুনা
জারুল তলায় একটি পাহাড় জল ফড়িঙের স্তব্ধ ডানা ।

নীলাম্বরী পাখির বাসা উড়াল প্রবণ সর্বনাশা
বাসার ভিতর ডিম
ডিমের ভিতর হলুদ চাঁদের লজ্জামাখা হিম ।

আজ দুপুরে প্রস্ফুটিত নরম রোদের আলো
আজ দুপুরে জারুল তলায় মাছেরা সাঁতরালো ।
কেউ হয়েছে মৎসকুমার, কেউ-বা জলের কন্যা
অন্যরকম নদীর ঢেউয়ে বন্য রকম বন্যা

দুপুর বেলার একটু পরে
জারুল ফুলের বৃষ্টি ঝরে
উষ্ণ চায়ের কাঁপে
টলমল মুখটা ভাসে
একজোড়া ঠোঁট নেমে আসে
আলতো চুমুর মাপে

হঠাৎ কালের ঘণ্টি বেজে উঠলো কেঁপে ঘড়ি
ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে আছে অন্যরকম তরী
ভালবাসার টিকেট কেটে যাচ্ছে অনেক দূর
যায় রেখে যায় জারুল তলায় চিরন্তনের সুর
জীবন তরী খাচ্ছে গিলে পাতাল তরীর দৈত্য
জারুলতলার দ্বৈত ছায়া চিরকালের সত্য ।


(জিরো পয়েন্ট, জারুলতলা, এগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি স্থানের নাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনকে নীল তিমিমাছ বলা হয়েছে। এখানকার ছোট ছোট বাসগুলোকে তরী নামে ডাকা হতো)

ঝর্ণার দেখা


কখনো দেখিনি আমি কেবল শুনেছি তার নাম
এতো কাছে তবু কতো দূরে!
দু'পাহাড় দূরে তার বাড়ি,
একদিন দুইদিন বহুদিন ধরে
সবুজ পাহাড় দুই হাঁটু ভাঁজ করে
লুকিয়ে রেখেছে তাকে মাঝখানে চোখের আড়ালে।

বিপদজনক খাদ, প্রবাহিত তরল আবেগ
শিরাউপশিরা বেয়ে কে যায় কে যায়
জীবনের দুপুরবেলায়?

ঝর্ণাসুতো দিয়ে নাকি সে তার দেহের ছবি আঁকে
কার খোঁজে অবিরাম এই ছুটোছুটি, খোঁজে কাকে?
তাকে দেখে পথঘাট থেমে যায়, তরুলতা ঝিম মেরে থাকে,
অহংকারী হরিণের শিং
সহজে আনত হয় উচ্ছলিত জলের ফেনায়।

জীবনের দুপুরবেলায়
আবার পিপাসা লাগে, নরম নগ্নতা থরথর
ছোঁয়া লেগে কেঁপে ওঠে প্রবীণ পাথর;
নতচক্ষু হয়ে আজ দেখি–
এতো জল এতো ঢেউ অনায়াসে ডুবে যেতে পারি,
ডুবে যেতে পারে ঘরবাড়ি।

সে-কোন শৈশবে ছিলে পাললিক পাথরের তলে
চোখের আড়ালে ঝর্ণা, কবে তুমি এত বড় হলে!

০৯.০৪.১১

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের পেছনে একটি ঝর্ণা আছে। দীর্ঘ কয়েক দশক এই অনুষদের শিক্ষক থাকলেও ময়ুখ চৌধুরীর ঝর্ণাটি দেখা হয়নি প্রথমে। পরে তিনি ১১ সালে একদিন এটি দেখতে যান এবং বিস্মিত হন। ফিরে এসে কবিতাটি লেখেন তিনি। এটিকে অবশ্য নিছক প্রাকৃতিক ঝর্ণার কবিতা হিসেবে না নিয়ে ঝর্ণা নামের কোনো মেয়ে, কিংবা অন্য অর্থেও পাঠ করা যায়। কবিতার নামটি তাঁর স্ত্রী কবি তাসলিমা শিরীণের দেয়া।

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

রোকেয়া হল, মেঘ, পাহাড় ও আপন মাহমুদের মৃত্যু




টু রোকেয়া হল


আমাদের প্রায় সবারই কিছু না কিছু গল্প আছে- আছে শৈশব মোমে জ্বলা
দু-একটি সিঁদুরে মুখ- দূরে, কাশবনের ভেতর থেকে বারবার বেরিয়ে আসা
ছেলেগুলো আমাদের বন্ধু- ভালোবাসার জন্য একদিন আমরা পকেটের গোপন
আধুলিটাও ভিক্ষুকের থালায় রেখেছি- অথচ, সায়মারা দেশছাড়া- শিরিনেরা
ঘোলাজলে দ্যাখে মুখ- আর লোপাদের মুখে কেবল সন্তানের দুষ্টুমি!


আমাদের কোনো কোনো বন্ধু স্বর্গে যাবে বলে মদের টেবিলেও মগজে টুপি
রাখতো- প্রায়ই আমরা বালিকাময় বিকেল ঘুরতে যেতাম- মাঠের মাঝখানে
বসে দেখতাম দূর্বাঘাসের চে অধিক নরম স্বপ্ন- অথচ, প্রিয় বন্ধুটির
কবরে মাটি না দিতে পারার আক্ষেপটুকুও আজ আমাদের কার নেই!


ঈশ্বর যেখানে আছে থাকুক, ওপথ আমার সরু মনে হয়- আমাদের চিয়ার্সের
শব্দ থেকেই শুরু হবে অনাগত গানের প্রবাহ- এই ভেবে এখনো আমরা
পানশালায় যায়, যদিও পুলিশ দেখলেই আজকাল মদের নেশা কেটে যায়!


আমাদের রয়েছে লিখতে না-পারার মতো দুর্যোগ আর ভালোবাসতে না-পারার
মতো অনটন- বন্ধুরা, আবহাওয়া ষোলই আগস্ট থেকেই খারাপ- সমুদ্রে লঘুচাপ
নৌকা ভীড়ে আছে উপকূলে- ঊনুনে শূন্যহাঁড়ি- জানি, বুকের আগুনে একটা ডিমও
সেদ্ধ হয় না- তবু, স্বর্গ যদি থাকে, তোমরা যাও- আমি রোকেয়া হলের দিকেই...



১৯৭৬ সালে জন্ম আপন মাহমুদের। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ২০১২ সালে মারা যান তিনি। মৃত্যুর এক বছর আগে, ১১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র কবিতাগ্রন্থ "সকালের দাঁড়ি কমা"। এ যেন আরেক আবুল হাসান এসেছিলেন বাংলা কবিতায়। আসুন তাঁর আরো কিছু কবিতা পাঠ করি।



কথা, পাহাড়ের সঙ্গে

পাহাড়, তোমাকে কিছু বলতে ইচ্ছে করে__ বিশেষত মনমরা বিকেলে
কী করো তুমি__ কার কথা ভাবো__ কে তোমার কান্নাকে প্রথম ঝরণা
বলেছিলো? আমি? আমি দু-চারটা সিগারেট বেশি খাই, চুপচাপ
ঘুরি-ফিরি__দাড়ি কেন কাটতে হবে, ভাবি...

মাঝেমাঝে নিজেকে শৈশবের হাতে তুলে দিয়ে ঘড়ি দেখি__ঘড়িতে
৩৪টা বাজে! ফুল পাখি নদী ওরা কেমন আছে?

পাহাড় তুমি কি জানো, রজনীগন্ধা সবজি নয় কেন!



ও মেঘ, বউয়ের মতো মেঘ

ও মেঘ, বউয়ের মতো মেঘ; আমাকে প্রেমিকার
মতো ভেজাও--দ্যাখো, চিন্তার সোনালি আঁশ শুকিয়ে
যাচ্ছে। আমি তেমন প্রার্থনা জানি না-- বড়জোর
ছেলেব্যাঙ-মেয়েব্যাঙয়ে বিয়ে দিতে পারি--থু লেপে
ভিজিয়ে দিতে পারি নিজের শুকনো ঠোঁট

মেঘ, তুমিও কি অপচয়ের ভয়ে আর আগের মতো
ঝরো না--জলখরচের ভয়ে আমি যেমন কান্নাকে
... দূরে রাখি--থাক অতো হিসাব-নিকাশ--দ্যাখো,
চালতাফুল তাকিয়ে আছে অবিবাহিত খালাতো
বোনের মতো! যদি ভেজাও তুমি--হবো শাপলায়
ভরে যাওয়া মাঠ

শুনো; গল্পের উঠান কি একাই ভিজবে আমাদের
সর্দি-কাশির অজুহাতে! এসো, ছাতাহীন হাঁটুরের মতো
ভিজি--আরো কাছে গিয়ে দেখি আষাঢ়ের ভেজা বউদি

ও মেঘ, বউয়ের মতো মেঘ; আমাকে সাহারার হাত
থেকে বাঁচাও।

আপন মাহমুদের বই



দৌড়

যেটুকু পথ পেরোতে বন্ধুদের তিন মিনিট লাগতো- তা অতিক্রম করতেই আমার লাগতো কমপক্ষে ত্রিশ মিনিট-এভাবেই একদিন আমি খুব পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম- পেছনে তাকালে আমাকে দেখতে পেতো না কেউ- পেছনে কেবল ঝরাপাতার ওড়াউড়ি, ফেল করা বালকের মুখচ্ছবি...
ইজিপশিয়ান সেই কচ্ছপের মতো এখন আমি তোমার কাছে পৌঁছে গেছি! কেউ নেই চারপাশে- চলো, আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা নতুন করে নিজেদের উচ্চতা মাপি- আর সবচে দ্রুতগতিসম্পন্ন বন্ধুটিকে প্রশ্ন করি, 'তোমার খোঁড়া বন্ধুটি কেমন আছে'
দৌড় ভালোবেসে যারা আজন্ম হতে চেয়েছিলো প্রথম- দ্যাখো, তাদের কেউ কেউ এখনো নিজেদের কাছেই পৌঁছাতে পারেনি! অথচ, বকুলপাড়ার পঙ্গু ছেলেটিই একগুচ্ছ ঘাসফুল নিয়ে এসে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করলো!


আপন মাহমুদের মৃত্যু নিয়ে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ এই কবিতাটি লেখেন:

আপন মাহমুদের মৃত্যু

আপন মাহমুদ ঐ অর্থে আমার আপন কেউ ছিলো না।
তার সাথে আমার ৪/৫ বার দেখা হয়েছে।
তারপর সে মারা গেছে।
আপন ভালো কবিতা লিখতো।
তার মৃত্যুর পর কবিমহলে খুব শোরগোল হয়।
আমার প্রথম মন খারাপ হয়েছিলো। পরে সব ঠিক হয়ে গেছে।
আমি ঐদিন খুব ভালোভাবে অফিস করেছি। টেলিভিশনে ফুটবল খেলা দেখেছি।
রাতের সংবাদের সময় এক মন্ত্রীকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিলাম।
তখন আপন মাহমুদ বললো, ইমতিয়াজ, আমি মারা গেছি আর আপনি হাসতেছেন!
আমি হাসি বন্ধ করলাম। আমি হাসি বন্ধ করে ঘুমাতে গেলাম।
আপন বললো, কবরের ভেতর খুব গরম।
ইমতিয়াজ এখানে কোন বাতাস নাই। ঘুম আসে না।
আমি বুঝতে পারলাম এক বন্ধুর মৃত্যুতে আমি সামান্য ঘোরগ্রস্থ হয়েছি।
আপন বললো, পরশু আপনার একটা কবিতা
আমার ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করে এসেছিলাম। দেখেছেন?
আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন ভোরে তাকে নিয়ে একটা গদ্য লিখতে বসলাম।
আমি মারা গেছি আর আপনি আমার মৃত্যু নিয়াও ব্যবসা শুরু করছেন!’
আমি আপন মাহমুদকে সাথে নিয়ে অফিস করলাম।
আপন বললো, কবরে এত নিঃসঙ্গ লাগে। এমন নিঃসঙ্গ!
সন্ধ্যায় তরুণ কবিকে নিয়ে একটা স্মরণ সভা ছিলো।
আমি যাবার জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম।
আমাকে আটকে দিলো!
সবাই যখন শোক করছে। স্মৃতিচারণ করছে। অনেক অনেক সভা করছে।
আমি তখন আপন মাহমুদের কবরটা কাঁধে নিয়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছি।

সংকলন: হুইসেল