শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

দ্যা প্রফেট: বন্ধুত্ব বিষয়ে - মুন আর ক্যামেলিয়া



বহুল আলোচিত কবি কাহলিল জিবরান তার The Prophet বইটিতে আধুনিক মানুষের চিত্তের অসুখের নিরাময় করতে চেয়েছেন। যেখানে মানব জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি ২৮টি স্তর নিয়ে বেশ খোলামেলাভাবে নিগুঢ় সত্য ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন । এর প্রথম অধ্যায়ের নাম ষড়াব এবং শেষ অধ্যায় দুটোর শিরোনাম উবধঃয এবং ঞযব ঋধৎববিষষ । এই লেখায় বইয়ের ঋৎরবহফংযরঢ় নামক অধ্যায় নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো।

বন্ধুত্ব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে কাহলিল জিবরান প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসের জায়গায় আঘাত করেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। প্রাথমিক ভাবে তিনি আলোচনা করেছেন বন্ধুত্বের মনঃস্তাত্বিক দিক ও মধ্যভাগে আলোচনা করেছেন বন্ধুত্বের স্বরুপ শেষ অংশে মতামত দিয়েছেন কেমন হওয়া উচিত বন্ধুত্বের সম্পর্কের রুপ।

শুরুতেই কবি বলেন, সে-ই তোমার বন্ধু , তোমার প্রয়োজনে যার কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাও । লেখক বন্ধুকে দেখিয়েছেন ফসলের মাঠের সাথে- যেখানে ভালবেসে বীজ বপন করি আর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে ফসল কেটে নিয়ে যাই। তিনি আরো বলেন, বন্ধু নিজেকে রক্ষা করার ঢাল। কোনো অজানা ক্ষুধা থেকে তার কাছে যাও, খুঁজে ফের একপ্রস্ত প্রশান্তি। বন্ধু যখন হৃদয় থেকে কথা বলে সে কথায় নির্দিধায় ‘না’ বলা যায়। আবার মনের সম্মতি ও জানানো যায় অবলীলায়। বন্ধুরা যখন নীরব থাকে তখন কেউ একে অন্যের মনের কথা শোনা বন্ধ করে না। এর কারণ, শব্দ ছাড়াই বন্ধুত্বের মাঝে সকল ভাবনা, সকল প্রত্যাশা, সকল আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয় আবার তা ভাগাভাগি হয় স্বতস্ফুর্তভাবে, যেখানে কোনো প্রত্যাশা থাকে না। বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় লগ্নে শোকার্ত হওয়ার কিছু নেই, কারণ বন্ধুর যেই গুণটি তোমার পছন্দের তার অবর্তমানে তুমি তা আরো বেশি স্পষ্ট দেখতে পাবে।

শেষ পর্যায়ে এসে জিবরান নির্দেশনা দিয়েছেন আত্মাকে উন্নত করা ছাড়া বন্ধুত্বে যেন আর কোনো উদ্দেশ্য না থাকে। কারণ যে ভালবাসা হৃদয়-রহস্যের সত্য উন্মোচন ছাড়া অন্যকোনো বস্তু খোঁজে, সেখানে মুল্যহীন অপ্রয়োজনীয় বিষয়ই জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরো বলেন, তোমার সর্বোচ্চ ভাল যা কিছু আছে তা-ই তোমার বন্ধুর জন্য রাখো। তোমার হৃদয়ের দুঃসহ যন্ত্রনার খবর তাকে জানালে তোমার হৃদয়ের উচ্ছাস-জলোচ্ছাসের খবরও তাকে জানিও।

কাহলিল জিবরান প্রশ্ন রেখেছেন, তুমি তোমার বন্ধুকে কেন খোঁজো? তার সময়কে হত্যা করার জন্যই কি? বরং সময়কে অর্থবহ করে তোলার জন্যই তার সন্ধ্যান করো । বন্ধুর প্রয়োজন পূরণ করো, তোমার শূন্যতা বা অপ্রাপ্তি তাকে দিয়ে পূরণ কোরো না। হাসি আর আনন্দ  বিনিময়ের মাধ্যমে বন্ধুত্ব মধুর হোক।

লেখক- শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শীতার্ত কবিতাগুচ্ছ - ময়ুখ চৌধুরী





শীতগল্প

খুব বেশি কিছু নয়, একটি উড়ন্ত পাতা সামান্য আশ্রয় চেয়েছিল
এই শীতে বাঘের নিশীথে;
স্বঘোষিত পুরোনো সেবক, ঐ দ্যাখো,
তোমার আশ্বাসে ভর করে
বিক্ষত পাখির ডানা উড়ে আসছে বিছানাবালিশ

সারাদিন দানাপানিহীন
একটি শীতার্ত দেহ
যথার্থ ঘুমের স্বপ্নে নুয়ে পড়া, ভারি দুটি চোখ
কতো দূর থেকে এলো কপট বাক্যের মমতায়
নাওয়া নেই খাওয়া নেই মধ্যরাতে শীতের করাত
এমন বিপন্ন সত্তা, তার মুখে খাদ্য নয় গান পুঁতে দিলে
রাজার বাড়ির গান ছটফটে রাতের ক্ষুধায়

কোথাও অনেক দূরে গরম ভাতের ধোঁয়া কুয়াশায় মেশে
কোথায় গরম ভাত, কোথায় লেপতোশক রাজার বাড়িতে যায় উড়ে

পড়ে থাকে ফুটপাথে রাতের ক্ষুধায়
নিহিত বিশ্বাসটুকু কুয়াশার কাফনে জড়ানো
এই তো শীতের গল্প, ঋতুচক্র, দেনা আর দায়
আহত পাখির মতো ইতিহাস অন্ধকারে যায়


শীতার্ত পঙক্তিমালা

শীত এসে গেছে।
খড়কুটো জড়ো করে আগুনকে ডেকে বললাম
আগুনের কাছে গেলে আরো বেশী শীত করে কেন?

রেলগাড়ি চলে গেছে। ইস্টিশনে ধ্রুবতারা জ্বলে,-
টিনের চাদর, নিচে কুয়াশায় কেটে গেছে দুই যুগ শীত;
শেষের কবিতা শেষে আরও কাছে এসেছে অমিত।

শীত এসে গেছে। এই শীত একজনে ঠেকাতে পারবে না।
এ কথার কী কী অর্থ হয়?
এর উত্তর জানে শুধু ইতালির মেয়ে সিনোরিতা,
যাবার আগেই তাই ঝরেছিল অতিরিক্ত দুচারটি পাতা।

কে কাকে বলেছে এই কথা-
এইবার খুব বেশী শীত পড়তে পারে
কেননা, আগের মতো থাকবো না কাছে।

এসব প্রশ্নের ছায়া রয়ে গেছে, শরীর কোথায়?
শরীর বরফে গেছে, বরফ গিয়েছে আজ আগুনের কাছে,
এখানে উদ্বৃত্ত কিছু ছাই পড়ে আছে।


ঋতুচক্রান্ত

মেরুদেশে দেখা হয় না
      শাদা বরফের সঙ্গে কাল বরফের
      রূপালি রোদের সঙ্গে সোনালি জোৎস্নার
-আগে দেখা হতো
ভূগোলের নিয়মমাফিক
মানুষেরা কাঁটাতার দিয়ে
      আকাশের নীল ছাতা আলাদা করেছে

আজ
   আলাদা ছাতার নিচে
   দূরে দূরে
   জ্যোৎস্না আর রোদ,

অথচ
   আলাদা আলাদা দুটো মুঠোর ভিতর
                 একটাই শীত


শীতগাছ

আবার এসেছে শীত কুয়াশা জমাট বাঁধে শীতগাছে,
বোঁটা ছিঁড়ে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে শীত জলের আকারে
অন্ধকারে কেঁপে ওঠে পাতার বুকের তলে বউপাতা,
ক্রমান্বয়ে পাতাগুলো সিঁড়ি হয়ে নামে; আগুনের খোঁজে

চরণেরা নেমে আসে টুপটাপ টুপ,
ভৌতিক লণ্ঠন জ্বল্ব জেগে থাকা ঘড়-বাড়ি চুপ-
সেখানে রচিত হয় হৃতকম্প ব্যতিরেকে শীতার্ত কবিতা
প্রকৃত বিধানমতে সেও চলে যাবে

তবুও কোথাও যেন একদিন শীত এসেছিল,
শরণার্থী হতে চেয়েছিল
একটি শালের নিচে,
দুটি শীতগাছ তার সবগুলো ডালপালা মেলে
অক্টোপাস হতে চেয়েছিল

শীতকাল আজও আসে, যথারীতি যায়;
তার কার্যকলাপের তেমন ব্যত্যয় কিছু নেই,
তবু বারবার শীত কিছু একটা ফেলে রেখে আসে

অন্ধকার শীতের পরিপ্রেক্ষিতে

অন্ধকার নামছে
কালো একটা কোটের মতো
শীতের শরীরে

শীত নামছে
তোমার আবৃত বুকের
ধবধবে খোঁপার মতো
পাহাড়ের চূড়ায়

অতঃপর
অন্ধকার শীত নামছে
প্রকাণ্ড এক ভালুকের মতো
একটি ঘরে,
যেখানে তুমি আর আমি

এসো,
আমরা বিষুবরেখা খুঁজি


ছবি: সনি


মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

শহর - শরীফুল আলম। কবিতা





রাজহাঁসের দল ঠিকই একদিন শহর ছেড়ে গেলো
আমি এক নিঃসঙ্গ প্রেত, নিস্তেজ হয়ে ভাবি
টপ হ্যাটের ভিতর থেকে যে ম্যাজিশিয়ান
সাদা খরগোশ তুলে এনেছিলো বহু বছর আগে
যার সারা গায়ে মখমলের মতো লোম
আমরা টিকে আছি বস্তুত এই লোমের গভীরে
আমাদের গন্তব্য প্রতিদিনই বদলায়
যেন সদ্য জেগে ওঠা কোনো দূরবর্তী উপকূল...





তোমার জোড়া চুপচাপ ঠোঁট, বিষণ্ন মুখ
আমার বহু বছরের না সেরে ওঠা অসুখ
দেখবে একদিন
তোমার শূন্য চোখও
আমার অপেক্ষায় ধুলোর শহর পোহায়
রাতের শহরে সমস্ত হাইওয়ের ফুটপাত ধরে হেঁটে বেড়ায়।


তারপর ধরো,
কবরে ছেয়ে গেলো একদিন সমস্ত শহর-সমভূমি
বুড়ো রাজপথে নকশাকাটা কফিনের মিছিল
দাবি একটাই- তাদের ডানা চাই!
সাদা গোলাপের দাম বেড়ে গেলো পৃথিবীতে, হঠাৎ...
শুধু আমার শেষ প্রেমিকার এ্যাপ্রোনের পকেটে থাকবে
পৃথিবীর শেষ লাল গোলাপ
তার তর্জনীর নখে আমার শেষ রক্ত বিন্দু
সেই সাথে আমার জন্মান্তরের ভালোবাসা...



লেখক- শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।