বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০১৯

ধর্মীয় মেলায় একটি বিজ্ঞান অনুষ্ঠান । বিজ্ঞান অবিজ্ঞান অপবিজ্ঞান



বোম্বাই শহরের দাদার বাত্তালায় আষাঢ়ী একাদশীর মেলাটি বোধহয় বোম্বাই-এর প্রাচীনতম মেলা। বোম্বাই এর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকে এই মেলায় ভগবান বিঠঠল রঘুমাইকে(বিষ্ণু ও লক্ষী) দর্শন করতে এসে থাকেন। এদের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে শুধু যে বারকারিরাই( বাউলের মতো একটি সম্প্রদায়) থাকেন তা নয়, শ্রমিক, ছাত্র ও মধ্যবিত্তরাও মৃদঙ্গ ও খঞ্জনী সহযোগে নাচগানে যোগ দেন। চারিদিকে মহারাষ্ট্রের সাধু-সন্তদের নামে জয়ধ্বনি উঠতে থাকে। গত বছর, ১৯৮০ সালের মেলায় ‘লোকবিজ্ঞান সংগঠন’ আয়োজিত একটি মেলার অনুষ্ঠান মেলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘চমৎকার বাবাকা রহস্য বিজ্ঞানকা’ ( চমৎকার বাবার বিজ্ঞানরহস্য)।
একটি প্রকান্ড জটাজুটধারী প্রতিকৃতির নিচে ‘লোকবিজ্ঞান’ লেখা ব্যানারটি মেলার দর্শকদের সংগঠনের স্টলের দিকে আকর্ষণ করছিল। ঠিক মধ্যরাত্রে ভজন ও জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে সপারিষদ বাবার প্রথম আবির্ভাব হয়। সিল্কের গেরুয়া, তিলক আর ফুলের মালার আতিশয্যে বাবাকে এক ‘পরমপুরুষে’র মতোই দিব্যতেজসম্পন্ন দেখাচ্ছিল। ভক্তিতে অনেক দর্শকেরই মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। বাবা তার নির্দিষ্ট সিংহাসনে বসে কিছুক্ষণ নিজের অবতারত্ব এবং ভাগবত কথামৃত বিতরণের পর ধ্যানে বসলেন। কিছুক্ষণ পর হঠাত বাবাজী উঠে দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ হলেন, এবং তারপরই নিজের অলৌকিক ক্ষমতার বলে দর্শকদের অবাক করতে শুরু করলেন। শূন্য থেকে ‘বিভূতি’ সৃষ্টি করে দর্শকদের মধ্যে বিতরণ করলেন; খালি কলসী থেকে পবিত্র গঙ্গোদক বের করলেন; দিব্যদৃষ্টিতে নোটের নম্বর বলতে লাগলেন; শুধুমাত্র দৃষ্টিশক্তির তেজ সঞ্চারিত করে রোগীকে সুস্থ করতে লাগলেন; বিনা রক্তপাতে নিজের জিভে সুচ ফুটিয়ে দিতে লাগলেন; আগুন পান করলেন; ঠোঁটে ছুঁয়ে টিউব লাইট জ্বালালেন; মানুষ এমনকি মুরগীকেও সম্মোহিত করে নানা ক্রিয়া দেখালেন;......এরকম অগুন্তি ক্রিয়াকলাপ দেখে উপস্থিত দর্শকবৃন্দ একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তারপরেই শুরু হলো এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ।
হঠাত বাবা তার জটা খুলে ফেলে, মেকআপ মুছে ফেলে এবং গেরুয়া বসন ত্যাগ করে দর্শকদের হতবাক করে দিলেন। তাঁবুর মধ্যে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এল। নকল বাবা এবার মাইক্রোফোন হাতে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলেন-‘ ভাই ও বোনেরা, আমি কোনো বাবা নই, ভগবান নই, এমনকি কোনো অবতারও নই, আমি একশ আট নামধারী কোনো শ্রীশ্রীঅমুক মহারাজাও নই। আমি “লোকবিজ্ঞান সংগঠনের” একজন সদস্যমাত্র। আমি আপনাদের সামনে যে-সব খেলা দেখালাম তা আদৌ কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, এগুলো শুধুমাত্র হাতের কৌশল বা কারচুপি আর সম্মোহনের খেলা। এই রকম অনেক ছলচাতুরী দেখিয়ে এবং গালভরা সব চমকদার কথার সাহায্যে আমাদের সমাজে অনেক “বাবা”, অনেক “গুরুদেব”, অনেক “সাধু” সরল জনতাকে ঠকিয়ে থাকে। আপনাদের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে এইরকম নানাবিধ চালাকির সাহায্যে ওরা আপনাদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসের ঝোঁক বাড়িয়ে দেয়। ধর্মের ভেকধারী এইসব তথাকথিত অবতারদের যদি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তি থাকে তবে তারা কেন লাখ লাখ ক্ষুধার্ত জনগণের সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দেয় না? কেন তারা অলৌকিক ক্ষমতাবলে কুষ্ঠের মতো ঘৃণ্য রোগ সারিয়ে দিতে পারে না? এর কারণ, আসলে এদের কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই, সব এদের বুজরুকি। যে কোনো তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতার পেছনেই আছে বৈজ্ঞানিক কৌশল; আপনারা সেই বিজ্ঞানকে চিনুন, জানুন। চোখ বুজে কোনো অলৌকিক ঘটনা বিশ্বাস করবেন না, যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এগুলোর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করুন। সমাজের ঐসব ধর্মব্যবসায়ী ধাপ্পাবাজদের থেকে দূরে থাকুন। বিজ্ঞানের সঠিক ব্যাখ্যা করলে তা আপনাদের অগ্রগতিরই সহায়ক হবে। আপনাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিজ্ঞানের এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহার করুন।‘
তারপর সেই নকল বাবা এবং তার সংগঠনের সদস্যরা দর্শকদের দেখানো অলৌকিক ক্রিয়াকলাপের পিছনের আসল কৌশলগুলি ব্যাখ্যা করলেন। আধঘন্টার এই ছোট্ট অনুষ্ঠানটি দেখে বেরুনোর পর দর্শকদের ওপর এর স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। অনেকে এগিয়ে এসে ‘লোকবিজ্ঞান সংগঠনে’র এই ধরণের প্রচেষ্ঠার প্রশংসা করলেন এবং এর সামাজিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করলেন। অনেকে আবার সেই ‘বাবা’ ছদ্মবেশী ভদ্রলোকের সাথে দেখা করে ম্যাজিকগুলোর সম্বন্ধে আরও কিছু জানতে চাইলেন। কেউ কেউ তাদের এত দিনের গভীর বিশ্বাসগুলো একদিনে ভেঙ্গে যাওয়াতে এতই হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন যে তাদের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে জানতে চাইলে তারা সাজিয়ে-গুছিয়ে কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। আবার অনেকে বিরূপ মতও প্রকাশ করেন, বলেন এটা একটা অর্থহীন অনুষ্ঠান।
সামগ্রিকভাবে দর্শক-সাধারণের এই প্রতিক্রিয়াগুলি অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে সংগঠনের পক্ষে জনমানসে অন্ধবিশ্বাসের গভীরতা ও ব্যাপ্তি সম্বন্ধে একটা গবেষণা চালানো সম্ভব হয়েছে। সামাজিক অবক্ষয়, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে এই ধরণের প্রত্যক্ষ গবেষণা অপরিহার্য না হলে সঠিক পথে এগুনো মুশকিল।
দশ মিনিট পর পর অনুষ্ঠিত আধঘন্টার এই অনুষ্ঠানের টিকিট ছিল পঞ্চাশ পয়সা। প্রায় ষোল-শ দর্শক এটা দেখেন।

মহারাষ্ট্র লোকবিজ্ঞান সংগঠন-এর একটি প্রয়াস।
[মূল রিপোর্ট-টি হিন্দিতে লেখেন মহারাষ্ট্রের ‘লোকবিজ্ঞান সংগঠনে’র পুরুষোত্তম ত্রিপাঠী। বাংলায় অনুবাদ করেন খড়গপুর ‘সায়েন্স এডুকেশন গ্রুপ’-এর দেবাশিস মিত্র ও চন্দন হালদার।]


সংগ্রহ: পলাশ সরকার
শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চবি। 

শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯

হিমু এবং কয়েকজন গ্রিক দেবী - ত্বরিকুল ইসলাম । গল্প



০১.
হিমু খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবী পরে শীতলক্ষা নদীর তীরে হাঁটছিলো। সামনে একটা বটগাছ। কাছে আসতেই বটগাছটা নড়েচড়ে উঠলো। হিমু নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো: স্বাগতম দেবরাজ জিউস।
জিউস একটু হতচকিত হলেও নিজেকে সামলে নিলেন। পুঁচকে একটা ছেলের কথায় হতচকিত হওয়া দেবরাজের শোভা পায় না। তিনি একটি স্বর্ণের আপেল হিমুর হাতে তুলে দিলেন। আপেলটির গায়ে লেখা- "স্বর্গ-মর্ত্যের সবচেয়ে সুন্দরী নারীর জন্য এই আপেল"।
জিউস বললেন,
--এই আপেলটা নিয়ে হেরা, এথেনা ও এফ্রোদিতি'র মাঝে তুমুল ঝগড়া চলছে। আমি চাই, তুমি মিমাংসা করে দাও কে ওদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর।
--আমি কেন?
--কাণ তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি। দেবীরা আপেলটি পাওয়ার জন্য নানারকম ঘুষ দিতে চাইবে। আমি জানি, তুমি এসবের কিছুই নেবে না। একে আমি নির্লোভ না বলে নির্বোধ-ই বলবো।
--বাবা আমাকে নির্বোধ বানাতে সারাজীবন চেষ্টা করেছেন। এজন্য আমার মাকে পর্যন্ত তিনি হত্যা করেছিলেন।
--তোমার বাবা ছিলেন বড়সড় রকম নির্বোধ। বলা যায় রাম নির্বোধ। রাম নির্বোধ না হলে ছেলেকে নির্বোধ বানাতে নিজের স্ত্রী-কে কেউ হত্যা করে না।
--আমার মায়ের মৃত্যুতে আমি একটুও কাঁদিনি। তা দেখে খুশিতে বাবার চোখে পানি চলে এসেছিলো। আজ আপনি আমাকে নির্বোধের যে স্‌বীকৃতি দিলেন। এটা দেখে বাবা নিশ্চয় নরকে বসে ইতোমধ্যে একহাটু চোখের পানি বিসর্জন করে ফেলছেন। আপনার নরকের সব আগুন সেই পানিতে নিভে গেছে!
জিউস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
--সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল নির্বোধদের জন্য নরকে কোনো আলাদা প্রকোষ্ঠ নেই। তাদেরকে স্বর্গে থাকতে হয়!
০২.
স্বর্ণের আপেলটি টেবিলের ঠিক মাঝখানে। হিমু টেবিলের ওপর মুখ রেখে জিহ্বা বের করে আপেলটির দিকে তাকিয়ে আছে।
আপেলটি স্টিভ জবসের 'এপল'-এর মত একপাশে কামড়ের দাগ। গাছের সেলুলোজিক আপেল হিমু অনেক খেয়েছে, কিন্তু স্বর্ণের আপেল খেয়ে দেখা হয় নি। তাই একটু আগে হিমু আপেলটি কামড়ে খেতে চেষ্টা করেছে। তিতা লাগায় 'ওয়াক থু' বলে ফেলে দিয়েছে। এই তেতো স্বর্ণের জন্য মানুষে মানুষে কত যুদ্ধ! কত রক্তপাত!!
--আমি দেবী সম্রাজ্ঞী হেরা
--বলো... (হিমু আপেল থেকে চোখ না সরিয়েই বললো)
--তুমি আপেলটি আমাকে দাও। পৃথীবির যাবতীয় সম্পদ আমার অধীনে। আমি তোমাকে অসীম ধন-সম্পদ দেবো।
--আর যদি আপেলটি তোমাকে না দেই?
--তাহলে তোমার সকল অর্থ সম্পদ আমি কেড়ে নেবো।
--কেড়ে নেওয়ার মত কোনো সম্পদ আমার নেই। তুমি চলে যাও।
দেবী হেরা ব্যর্থ হয়ে খালি হাতে ফিরে গেলো।
০৩.
--আমি দেবী এথেনা, আপেলটি আমাকে দাও।
--দিলে আমি কি পাবো?
--আমি জ্ঞানের দেবী। আপেলটি দিলে আমি তোমাকে বিদ্যা-বুদ্ধিতে পৃথীবিতে অদ্বিতীয় করে দেবো।
--যদি না দেই?
--তাহলে তোমার সকল বিদ্যা-বুদ্ধি কেড়ে নেবো।
--বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়ে আমি কি করবো। আমার সারাজীবনের সাধনা একজন খাঁটি নির্বোধ হওয়ার। আমাকে কেউ নির্বোধ বললে আমার রাম-নির্বোধ বাবা স্বর্গে বসে খুশিতে কেঁদে ফেলেন। তার অশ্রুতে স্বর্গের ফ্লোর ভিজে জবজব করে। আমি নির্বোধ-ই থাকতে চাই। তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। তুমি যাও।
এথেনা হতাশ হয়ে চলে গেলো।
০৪.
হিমু এখনো জিহ্বা বের করে আপেলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ঘরে প্রেমের দেবী এফ্রোদিতি প্রবেশ করলো। সাথে সাথে ঘরময় গোলাপের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো।
--আপেলটি আমাকে দাও। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি তোমাকে দেবো।
হিমু মুচকি হাসলো।
--পৃথীবির সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি আমার আছে। আমার রূপা, আমার নীল পাখি।
--যদি আপেলটি আমাকে না দাও তাহলে রূপাকে তুমি কোনদিন পাবে না। আমি তোমাদের মিলন হতে দেবো না।
--আমি চাই রূপার সাথে আমার মিলন না হোক।
এফ্রোদিতি অবাক হয়ে হিমুর দিকে তাকালো..
--তুমি রুপাকে ভালোবাসো, অথচ রূপাকে কাছে পেতে চাও না!
--না, চাই না। কারন আমি তাকে ভালোবাসি। এবং ভালোবাসা ছাড়া আমি তাকে আর কিছুই দিতে পারবো না। আমি তার যোগ্য না।
--কিন্তু..
--ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে অমর।
এফ্রোদিতি চেয়ে দেখলো, হিমুর চোখে জল। জীবনে এই প্রথম হিমু কাঁদছে...
এফ্রোদিতি কিছু না বলে নিরবে চলে গেলো।
স্বর্গে বসে হিমুর রাম-নির্বোধ পিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মিশন অবশেষে ব্যর্থ হয়েছে। তার ছেলে প্রেমে পড়েছে।
০৫.
শীতলক্ষা নদীতে হিমু আপেলটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। আশেপাশের কারখানাগুলো থেকে ছড়ছড় করে বের হয়ে আসা টেক্সটাইলের বর্জ্যে আপেলটি গলে মিশে যাক।
একমাত্র টেক্সটাইলের বর্জ্য স্বর্ণের আপেলকেও গলিয়ে নিঃশেষ করে দিতে পারে!

গল্পকার: ত্বরিকুল ইসলাম, 
প্রভাষক, বেগমগঞ্জ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার কলেজ।

বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯

চরম নৈরাশ্যবাদী সময়কাল থেকে বলছি - শর্মী দে । কবিতা



শর্মী দে



আপনাদের মত আমরাও আশাবাদী হতে চাই

ওগো আশাবাদী যুগের সুবোধ কবিবর,



যে জীবন জেগেছিল অন্ধকার তাড়ানিয়া সূর্যের মতন

সে জীবন কেন আজ মৃতপ্রায়?



আপনি বলছেন - ও তাদের ঘুম,

সময় হলেই জেগে উঠবে।



সময় আর হবে কবে?

আমার বাস্তুভিটার সর্বস্ব লুট হলে তবেই কি ওরা জাগবে??



কবে আসবে সেই সময়ের হাঁক

ওগো কবি, কবে জাগবে?

কেন ওরা মুক্তি এনে দিয়েই ক্ষান্ত দেয়,



ওরা কি জানে না

এই ঘুমন্ত রাতেই চুরি যায় আমাদের স্বপ্ন?

এই ঘুমন্ত সময়েই আমাদের বাস্তভিটায় বসতি গড়ে উইপোকারা,

কোন এক অমাবস্যার রাতে

আমার আতুড়ঘরের মধ্যমণি খুঁটিটি খুলে নিয়ে পালায় কয়েকটি চামচিকা,

ঘুণে ধরে বাকি তিনটি খুঁটিতেও।



কিতাবের পাতায় জিহ্বা লেহন করে কয়েকটি কুকুর,

আমার রাষ্ট্রের ন্যায়কুটির গুড়িয়ে দেয়

সেদিনকার মত শকুনেরা নয়

আজকের শেয়ালেরা।



ওরা কি জানে না 

যতবার রক্তগঙ্গায় ভেসে মানুষ এনেছে মুক্তি,

ততবারই সেই রক্তে ভেজা উর্বর পলিতে জন্মেছে আগাছা,

পরিপুষ্ট পরগাছারা ঢেকে দিয়েছে সবুজ বৃক্ষ,

আমার, আমাদের,

মানুষের যত্নে লালিত শাশ্বত বৃক্ষ।



লেখক :শিক্ষার্থী, ৪র্থ বর্ষ, বাংলা বিভাগ, চবি।
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: পূর্বাপর



মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯

আশহাদুআল্লাইলাহাইল্লাল্লাহ - সাদী কাউকাব

সাদি কাউকাব


খোদা, সম্মিলিত সেজদা আমি দেবো না


লোক দেখানো নামাজে তোমার বীতরাগ

এ কথা আমি কী করে বুঝাই, তোমার কঠোর ঘোষণা

তোমাকে নীরবে খোঁজার



আমি ভয় পাই, খোদা, নিজের চেয়েও তোমাকে ছাড়ার

তাই চক্ষু চড়ক রাখি

ভুল করেও দেই না কুর্নিশ, দেবো না কুর্নিশ

এই ভালোবাসা ভুল বুঝে তাবৎ সাজেদ, জানি

আমার শির নিতে কোষ মুক্ত করবে তলোয়ার



শুনো খোদা, তখন তোমাকে

আরো একবার ভালোবেসে তাদের কলবে জুড়ে দিয়ে যাব

তোমার গূঢ় অন্ধকার।।

লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, চতটগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯

প্রত্যাবর্তনের লজ্জায় আল মাহমুদ





কমলাপুর রেল স্টেশন চালু হয় ১৯৬৮ সালের ১লা মে। এর আগ পর্যন্ত ঢাকার রেলস্টেশন ছিল ফুলবাড়িয়া স্টেশন। ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’  গ্রন্থে আল মাহমুদ লিখেছেন—“১৯৬০ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি এক শীতের সকালে আমি একটি ভাঙা স্যুটকেস হাতে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে এসে নামলাম।” (রাজনীতিতে মেজর জিয়ার আর সাহিত্যে আল মাহমুদের ভাঙা স্যুটকেস খুবই বিখ্যাত।) মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করে আল মাহমুদ কবি হওয়ার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন, নিঃসম্বল অবস্থায়। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয়, কবি হওয়ার জন্য ঢাকায় আসা— এ কেবল আল মাহমুদের পক্ষেই সম্ভব ছিল।

‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ নামে তাঁর একটা কবিতা আছে। যেখানে তিনি শেষ ট্রেন ধরবেন বলে এক রকম ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌঁছে দেখেন, ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। যাদের সাথে শহরে যাবার কথা ছিল, ট্রেনের জানালায় তাদের উৎকণ্ঠিত মুখ, তারা তাঁকে সান্ত্বনা জানায়। সাত মাইল হেঁটে এসে শেষ রাতের গাড়ি হারিয়ে তিনি এক অখ্যাত স্টেশনে কাঁপতে থাকেন। তারপর নিজের গ্রামে ফিরতে শুরু করেন। এই কবিতার গল্পটা রূপক। আল মাহমুদ তার জীবনে কোথায় পৌঁছতে গিয়েও আগের জায়গায় ফিরে আসেন?

আমরা জানি, আল মাহমুদ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সমাজতন্ত্র নিয়ে তাঁর ‘সোনালি কাবিন’ থেকে উৎকৃষ্ট কবিতা বাংলা ভাষায় লেখা হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, যেই পত্রিকা মুজিববিরোধী তথা জাসদপন্থী ছিল। পত্রিকাটি সরকারের রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়, আর গ্রেফতারের শিকার হতে হয় কবিকে।

আল মাহমুদ পীর বংশের ছেলে। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় আবহে তিনি বড় হন। কিন্তু সে সময়টায় তিনি ঝুঁকে ছিলেন নাস্তিকতার দিকে। একদা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, “আমাদের কলাকেন্দ্রে, আমাদের সর্ব কারুকাজে/অস্তিবাদী জিরাফেরা বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত গলা।” পঁচাত্তর সালে তিনি মুক্তি পান। এরমধ্যেই, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার মনোজগতে আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। তিনি লেখেন: “আমি কুণ্ডলীকৃত কালো ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে/ধ্বংসের ওপর রেখে আসা আল্লার আদেশ/বুকে তুলে নিলাম।”

জেল থেকে বেরিয়ে যখন তিনি তাঁর বিশ্বাসের পরিবর্তনের কথা জানান, তখন পুরানো বন্ধুদের কাউকে তিনি পাশে পেলেন না। পরিজনহীন কবি, ঢাকা মহানগরীতে যেন এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান। যেরকম বিব্রতকর পরিস্থিতির দেখা পাই আমরা “প্রত্যাবর্তনের লজ্জা” কবিতায়, যখন তিনি ট্রেন মিস করে বাড়ি ফিরে আসেন এবং নিজের প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে মায়ের আঁচলে ঘষে তুলে ফেলার কথা বলেন। এই লজ্জা কি তবে ধর্মীয় আবহে বড় হয়ে শহরে গিয়ে অবিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে সেই পথে পুরোপুরি না গিয়ে ইসলামের দিকে ফিরে আসার কারণেই? এই কবিতায় “ফাবি আইয়ি আলা ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” পড়ি, যেটা, কবি'র দাবী অনুযায়ী, বাংলা কবিতায় কোরানের আয়াতের প্রথম সার্থক ব্যবহার। এই আয়াত কি ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তনকেই ইঙ্গিত করে?

কিন্তু না, আমরা এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে পারছি না। কারণটা সহজ। এই কবিতাটি যেই সোনালি কাবিন গ্রন্থের, তা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে। আর আল মাহমুদের বিশ্বাসের পরিবর্তন হয় ৭৫-এ। তাই আমরা ভিন্ন এক ব্যাখ্যার দিকে যেতে চাই।

দশকের হিসেবে আল মাহমুদের আবির্ভাব পঞ্চাশের দশকে। সেসময় যারা তাঁর সতীর্থ কবি ছিলেন, যেমন শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, তাঁরা তখন সমানে নগরকেন্দ্রিক কবিতা লিখে চলেছেন। কিন্তু আল মাহমুদ সে পথে গেলেন না, বাংলা কবিতায় তিনি সংযোজন করলেন এক অসামান্য অধ্যায়ের। তিনি আধুনিক কবিতায় গ্রামকে নিয়ে এলেন। গ্রামে প্রচলিত শব্দকে অসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ততায় প্রয়োগ করলেন কবিতায়। সোনালি কাবিন কবিতার একটি লাইন “তস্করের হাত থেকে জেয়র কি পাওয়া যায় ত্বরা”, তস্কর, জেয়র (অলংকার), ত্বরা, এরকম অজস্র গ্রামীণ শব্দ আল মাহমুদের আগে বাংলা কবিতায় কেউ ব্যবহার করেনি। “পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ”-এর কথা, শস্যের শিল্পী, খেতের আল, খড়ের গুম্বজ, নদীর ভাঙন, বাছুর হারিয়ে ফেলা সলিমের বউ, লাউমাচা আর দুগ্ধবতী হালাল পশুর মতো চিরায়ত বাংলার আরো অনেক লোকজ প্রসঙ্গের দেখা মেলে তার কবিতায়। এসব কবিতায় গ্রামবাংলার মাটির নিবিড় ঘ্রাণ পাওয়া যায়।

আল মাহমুদ কবি হওয়ার জন্য ১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে আক্ষরিকভাবে গ্রাম থেকে শহরে গেলেও, কবিতায় তিনি তার তাঁর সহযাত্রীদের মতো গ্রামকে ছেড়ে যাননি। এর জন্য তাকে কটাক্ষের শিকারও হতে হয়েছিল। তিনি হয়ত বিব্রতও হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা মায়ের আঁচলে, তিনি সমস্ত দ্বিধাকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন। আর কোরআনের ওই আয়াত, সেটা কেবল গ্রামবাংলার একটা সাধারণ চিত্র হিসেবেই এসেছে। কবি ব্যক্তিজীবনে একসময়ে নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকলেও, নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কখনো অস্বীকার করতে চাননি। বাংলা কবিতায় যে অসাধারণ কা- তিনি ঘটিয়েছেন, তা-ই তাঁকে আমাদের সময়ের প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভাগ্যিস, শহরের ট্রেন তিনি মিস করেছিলেন।

লেখক: দেওয়ান তাহমিদ
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চবি। 

বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই, ২০১৯

ভুঁইফোঁড় শিব আর কাদুনে প্রতিমা । বিজ্ঞান অবিজ্ঞান অপবিজ্ঞান

                                 

শিবঠাকুর একবার নাকি একেবারেই ভুঁই ফুঁড়েই উঠেছিলেন-খোদ বেনারসে। পুরোনো লোকের মুখে শোনা, বছর চল্লিশ-পঞ্চাশ আগেকার কাহিনী।
বাঘা বাঘা অলৌকিক আর দৈব ঘটনার সাক্ষী এই ‘পূণ্যধাম’ বারানসী। কিন্তু এ-ঘটনার যেন তুলনা নেই। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সংবাদ। দেবমাহাত্ম্যের ছটায় শীর্ণ-দীর্ণ মানুষজনের বুকে অপার প্রত্যাশার বান ডেকে যায়-আর দুঃখ নেই, কলিকালের শেষ। আর তক্ক নয়, অবিশ্বাস নয়; শুধু ফুল চড়াতে হবে, পাতা চড়াতে হবে, জল ঢালতে হবে বাবার মাথায়। আর হ্যাঁ, সেবাইতের দক্ষিণাটাও চাই। ব্যাস, মুশকিল আসান।
ঘটনাটা এই-সময়ের সাথে সাথে একটু একটু করে শিবলিঙ্গ মাটি ফুঁড়ে উঠে আসছে আপনা আপনি। বেনারসের বিস্মিত বিমূঢ় ভক্তজন চোখ ভরে প্রাণ ভরে দেখছে বাবার উত্থানকোনো ভুল নেই, কোনো দৃষ্টিবিভ্রম নেই, একেবারে ফটফটে সূর্যের আলোয় মাটির ফাটল দিয়ে উঠে আসছে শিবলিঙ্গের মাথা।...
কিন্তু এমন তাজ্জব ঘটনার সমাপ্তিটা ছিল ততোধিক চমকপ্রদ। রোমাঞ্চকর রহস্যটা কেমন করে না-জানি ফাঁস হয়ে গেল! উত্থিত শিবলিঙ্গের ঠিক নিচেই, মাটির মধ্যে পাওয়া গেল এক বস্তা ছোলা। আগেভাগে মাটি খুঁড়ে পোঁতা হয়েছিল এটি, তার ওপর বসানো হয়েছিলো শিব। অতঃপর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে শুকনো ছোলা ভিজে মাটির জলীয় অংশ টেনে নিয়ে ফুলতে শুরু করেছে। এক বস্তা ছোলা অঙ্কুরোদগমের তাড়নায় ক্রমশ ফুলছে, চাপ বাড়ছে। আবদ্ধ গর্তে চারপাশে বাড়বার জায়গা নেই, তার মাথার ওপর স্বয়ং শিব। অথচ বেড়ে ওঠার জায়গা কেবল ওপরেই। বস্তা ভর্তি ছোলার সম্মিলিত চাপ বা ধাক্কা সামলাতে পারে না সেই কৃষ্ণবর্ণের বেসল্ট পাথরের খন্ডটি। তাই শিবঠাকুর একটু একটু করে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আর দর্শকের বিস্ময়ের মাত্রা বাড়ে। ( আর লাফ দিয়ে বাড়ে সেবাইতের ফুর্তি!) এই অভিনব কৌশলের শেষ-রক্ষা হয় নি, অঙ্কুরিত ছোলায় ভরা বস্তা বেরিয়ে পড়েছে জাগ্রত শিবের তলা থেকে।
এতো অনেক দূর। অতদূরে যাওয়ার দরকার নেই। খোদ কলকাতাতেই বিশের দশকে (সম্ভবত ১৯২৮ সালে) অবিকল একইভাবে ভুঁই ফুঁড়ে উঠেছিলেন- শিব নন, কালী। কার প্রতি নাকি স্বপ্নাদেশ হয়েছিলো- গঙ্গার তীরে ইডেন গার্ডেনে হাজার বছর ধরে বন্দিনী মা কালী; তাঁর বন্দীদশা শেষ হয়েছে, এবার তিনি মেদিনী ফাটিয়ে উঠছেন। যথারীতি ভিড় উপচে পড়ল। দর্শকের বিস্ময়বিহ্বলতার সীমা ছাড়িয়ে দেবীর আবির্ভাব হলোতারপর সে বিগ্রহ মহাধুমধামে প্রতিষ্ঠিত হলো দক্ষিণেশ্বরের কাছে আদ্যাপীঠের মন্দিরে। এর মধ্যে ছোলার বস্তা রহস্য ফাঁস হয়েছে। সাহস করে এগিয়ে এসেছেন কয়েকজন সত্যানুসন্ধানী। সন্দেহ-তর্ক-অভিযোগ ক্রমে দানা বাঁধতে থাকল। নাটকের কর্ণধারেরা প্রাথমিক আস্ফালনের পর একটু কোণঠাসা হয়ে পড়লেন- কয়েক সহস্র বছরের প্রাচীন কালী মূর্তি ওভাবে আগের রাতে মাটিতে পুতে রাখা সম্ভব? একি পাগলের প্রলাপ নয়? ডাক পড়ল বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্মতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের। তিনি আদ্যাপীঠে প্রতিষ্ঠিত সেই কালী বিগ্রহ দেখে, পরীক্ষা করে, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মত দিলেন; এই মূর্তি একেবারেই নবীন, হালে তৈরী। একে কয়েক সহস্র বছরের প্রাচীন বলাটাই নিছক মুর্খামি বা পাগলামি। কেলেংকারী ষোলকলায় পূর্ণ হলো। চতুরদিকে খবর ছড়িয়ে গেল। বোকা বোনার লজ্জায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল বহু সাধারন মানুষ। জান-মান রাখতে আবার এক স্বপ্নাদেশের উছিলায় সে কালী মূর্তি বিসর্জন দিতে হলো গঙ্গায়। এই ঘটনার পরে বেশ কয়েক বছর আদ্যাপীঠের মন্দির বিগ্রহশূন্য ছিল। বর্তমানে যে দেবী প্রতিমা আদ্যাপীঠে রয়েছে তার প্রতিষ্ঠা হয় মাত্র বছর কুড়ি আগে।
বিশাল ভারতবর্ষের একোণে-সেকোণে আজও এমন ঘটনা ঘটে চলে। কেউ ঠাকুর খুঁজে পান স্নান করতে গিয়ে, কেউবা বিগ্রহ উদ্ধার করেন স্বপ্নে জায়গা খুঁড়ে। আগেভাগেই জলে বা মাটিতে পাথরটা পুঁতে রেখে এসে পরে স্বপ্নের কথাটা প্রচার করা হয়, ঘটনাটিতে অলৌকিকত্ত্ব আরোপ করার জন্য, এই রুঢ় বাস্তব সম্ভাবনার কথা আমাদের দুর্বল মনে সহজে যায়গা পায় না। কেন পায় না সে আলাদা সমস্যা। কিন্তু এ সমস্যা শুধু আজকের নয়। মানুষের দুঃখ, দুর্বলতা, অসহায় পরিণতিতে ঈশ্বর-নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে শুধু এই ঘোর কলিতেই নয়, অতীতের তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগে’ও লোকঠকানো ব্যবসা চলত রে-রে করে। চলত সরাসরি রাজ অনুগ্রহেই। ব্যবসার সিংহভাগ রাজাই দখল করতেন। অবশ্য এসব কথা সাধারণ প্রজার কাছে গোপন থাকত। অন্তত ২২০০ বছর আগেও এই ঘৃণ্য জুয়াচুরির মাধ্যমে প্রজাশোষণের উল্লেখ করে গেছেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত-মন্ত্রী বর্ণগর্বী বুদ্ধিজীবী কৌটিল্য তাঁর বর্ণাশ্রম রক্ষার নীতি ও উপদেশ-গ্রন্থ “অর্থশাস্ত্রে”র পঞ্চম অধিকরণের দ্বিতীয় অধ্যায়ে।
“কোনও প্রসিদ্ধ পুণ্যস্থানে ভূমি ভেদপূর্বক দেবতা নির্গত হইয়াছেন এই ছলে সেখানে রাত্রিতে বা নির্জনে একটি দেবতার বেদী স্থাপন করিয়া ও এই উপলক্ষ্যে উৎসবাদি ও মেলা বসাইয়া সেই স্থানে শ্রদ্ধালু লোকের প্রদত্ত ধন দেবতাধ্যক্ষ গোপনে রাজ-সমীপে অর্পণ করিবেন” (কৌটিল্য, অর্থশাস্ত্র, ৫ম অধিকরণ, ২য় অধ্যায়, ৯০তম প্রকরণ) সেনাধ্যক্ষের মত দেবতাধ্যক্ষ কৃষিবিভাগ, সেনাবিভাগের মতো দেবতাবিভাগ মঠ-মন্দির-বিগ্রহ সংক্রান্ত দফতর সেই দফতরের অধ্যক্ষই দেবতাধ্যক্ষ ওর দায়িত্ব: “দেবতাধ্যক্ষ দুর্গের ও রাষ্ট্রের দেবতাগণের ধন যথাযথভাবে একস্থানে একত্রিত রাখিবেন এবং সেইভাবেই রাজাকে আনিয়া দিবেন” ( , ..৯০) এ থেকেই বোঝা যায় যে, সেকালের ধর্ম-ব্যবসা কোনো বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছিল না, রীতিমতো চেয়ার-টেবিল-বেয়ারা-পিওন শোভিত পুরোদস্তুর দফতরের পরিচালনায় এ ছিল এক সুসংগঠিত, চক্রান্তমূলক প্রক্রিয়া লোক-ঠকানোর উপায়গুলোও ছিল বহুবিচিত্র-সাধারণ মানুষের মানসিকতা সম্পর্কে সু-অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ মগজের চমকপ্রদ সে সব কৌশল
“দেবতাধ্যক্ষ ইহাও প্রচার করিতে পারেন যে, উপবনে একটি বৃক্ষ অকালে পুষ্প ও ফলযুক্ত হইয়াছে এবং ইহা হইতেই সেখানে দেবতার আগমন নিশ্চিত হইয়াছে।” ( , ..৯০) অতএব ভক্তগণ, মঙ্গলার্থে ফেলো কড়ি সিদ্ধপুরুষের বেশধারী গুপ্তচরেরা( শ্মশানাদির নিকটবর্তী) কোন বৃক্ষে প্রতিদিন এক একটি মানুষ ভক্ষণার্থ কররূপে দিতে হইবে এই মর্মে রাক্ষসের ভয় উৎপাদন করিয়া পৌর জানজনপদ হইতে বহু টাকা লইয়া সেই ভয়ের প্রতিকার করিবে; অর্থাৎ রাক্ষসভয়ে স্বজীবণার্থ প্রদত্ত টাকা রাজাকে গোপনে অর্পণ করিবে।” ( ঐ)। চমৎকার! অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে দু-তিনটি নিরপরাধ মানুষকে গুম করো। তারপর ভীতিবিস্মিত প্রজাদের কাছে লাল কাপড় আর জটায় সেজে গিয়ে বল, “রাক্ষস এসেছে গো। ওকে না মারলে রোজ মানুষ খাবে।” অতএব দাও টাকা। রাক্ষস মারতে কতো খরচ, যাগ-যজ্ঞ, পূজো-আচ্চা সবেতেই তো টাকার শ্রাদ্ধ।
“কোন সুড়ঙ্গযুক্ত তিন বা পাঁচ সংখ্যা পরিমিত মস্তকযুক্ত নাগমুর্তি দর্শকবৃন্দকে দেখাইয়া তাহাদের নিকট হইতে হিরণ্য বা টাকা উপহাররূপে লইবে এবং সেই টাকা রাজসমীপে অর্পণ করিবে।” (ঐ)। তিন বা পাঁচ মাথাওয়ালা সাপ! যে সে জিনিস নয় বাছা, খোদ বাসুকির মেয়ের ঘরের আপন নাতি। অতএব দাও কিছু। সাধারন কুয়োর মধ্যে খোঁড়া অনুভূমিক সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থেকে, সেই আধো-অন্ধকার পরিবেশে পাঁচমাথাওয়ালা সাপের মূর্তি দেখিয়ে তাকে জ্যান্ত আসল সাপ বলে সরলমতি শ্রদ্ধালু মানুষজনকে বিশ্বাস করানো এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। পয়সা আদায়ের এমন দাঁও ছাড়া যায়?
সত্যিই ছাড়া যায় না। আর সেই কারণেই দু-হাজার বছর পরেও এই জাতীয় চাতুরিতেই অর্থাগম হয় বহু দেবস্থানে- কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গে, ভারতবর্ষে...।
কিন্তু এটাই সব নয়। এই প্রতারণার মুখোশ ছেঁড়বার একটি সমান্তরাল ধারাও একইসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে। যেমন দেখেছি আমরা ভুঁইফোঁড় শিব-কালীর ক্ষেত্রে।
একালের মতো সেকালেও কিছু মানুষ ছিলেন যারা সহজে ঐ বুজরুকদের অপকৌশলগুলোকে মেনে নিতেন না; প্রশ্ন করতেন, সন্দেহ প্রকাশ করতেন, অনুসন্ধান করতেন প্রত্যেকটি ব্যাপারে। মুষ্ঠিমেয় স্বার্থান্বেষীরা যে জাল-জুয়াচুরি করে সাদাকে কালো করে দেখাত তার ফলে সাধারণ লোকের শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিই নয়, তাদের মনে জগত সংসার সম্বন্ধে এক ভুল, অবাস্তব, কাল্পনিক ধারণার সৃষ্টি হতো। মানুষ হয়ে পড়ত মোহগ্রস্থ, ভীরু, অদৃষ্টবাদী। আর শোষণ ও প্রভুত্বকে অব্যাহত রাখার জন্য এটাই তো চাই। এই মানসিক লুঠ, মানসিক ক্ষতিকে স্বীকার করে নিতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না পুরনো আমলের বস্তুবাদীরা। ব্যবসার শত্রু এই ধরণের অশ্রদ্ধালু লোকের শিক্ষার নামে বিলক্ষণ শাস্তির ব্যবস্থা করত তৎকালীন রাষ্ট্র। চাণক্য পন্ডিত এদের সম্পর্কে বিধান দিয়েছেনঃ “যাহারা অশ্রদ্ধালু তাহাদিগকে ভোজন ও স্নানাদি দ্রব্যে স্বল্পমাত্রায় বিষ মিশাইয়া মোহিত করিয়া ‘ইহা দেবতার অভিশাপ’ বলিয়া প্রচার করিবে”। অর্থাৎ, আমাদের পেছনে লেগ না, তাঁর ফল ভালো হবে নাএই ভীতিকর শিক্ষা সর্বস্তরের মানুষের মনে গেঁথে দিতে হবে- এই ছিল চাণক্যের অভিমত।
আগের কথা বাদ দিলেও বিগত সোয়া-দুই-হাজার বছর ধরে কৌটিল্য বর্ণিত পথে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার কলঙ্কময় অধ্যায়ের পাশাপাশি রয়েছে এর বিরোধিতার এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। তাই তো বিসর্জনের দিন মাটির প্রতিমার চোখ জলে ভিজে যাওয়ার মতো ঘটনা যেমন আজো ঘটে, তেমনি আবার অসংখ্য মুগ্ধ জনতার ভিড়ের মধ্যে সেই মানুষদেরও খুঁজে পাওয়া যায়, যারা সেই ক্রন্দনরতা দেবী মূর্তির পেছনের আসল রহস্যটা খুঁজে বের না করা পর্যন্ত শান্তি পান না। বুঝতেই পারছেন, এই ‘দেবীর ক্রন্দন’ ব্যাপারটা মোটেই প্রাচীন নয়, একেবারে হাল আমলের। বছর কয়েক আগে, দক্ষিণ কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডে ২৩-পল্লীর দূর্গোৎসবে সেই দূর্গার কান্নার দরুন প্রতিমার বিসর্জন বন্ধ হওয়ার ঘটনা যে-কোনো কলকাতাবাসীরই মনে পড়বে। মায়ের চোখের জল শুকোয় না, প্রতিমারও বিসর্জন হয় না। এভাবে কিন্তু বেশিদিন যায় নি। কিছুদিনের মধ্যেই যখন দেখা গেল যে, পুরো ব্যাপারটা জমি দখলের এক চক্রান্তের সাথে জড়িত বলে খবর প্রকাশ হচ্ছে, তখন ঢাক-কাঁসি পিটিয়ে কাঁদুনে প্রতিমার বিসর্জন হলো।
একইসঙ্গে মনে পড়বে ২৩-পল্লী থেকে আরেকটু উত্তরে রূপনারায়ন নন্দন লেন আর  শম্ভুনাথ পন্ডিত রোডের মোড়ে শীতলা মন্দিরে ক্রন্দনরতা প্রতিমার কথা। ১৯৬৮-৬৯ সালের কথা বলছি। কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করছেন মা শীতলা, তাই দেখতে কাতারে কাতারে ভিড়; আর দক্ষিণার নোট-মুদ্রায় থালা উপচে পড়ছে। এ-নাটকের যবনিকা পড়তে বেশি সময় লাগে নি। গুঞ্জন শুরু হলো, অনুসন্ধানও হলো। কেউ বললে প্রতিমার চোখ ঘামতেল, কেউ বললে গ্লিসারিন, কেউ বললে দেবী মূর্তির পেছন থেকে সরু নল ঢুকিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল ফেলা হয়েছে চোখে। কাগজে খবর বেরিয়ে বেজায় হৈ-চৈ হলো। ব্যবসার বাড়তি মুনাফা বন্ধ হলো।
এই ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপটে ভেসে ওঠে আগামীকালের সেইসব সচেতন মানুষের ছবি যারা এই ঘৃণ্য জালিয়াতির মুখোশ খুলেই চলবেন সর্বত্র।


সাহায্যকারী সুত্র:
১। “কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র”, ড. রাধাগোবিন্দ বসাক কর্তৃক বঙ্গভাষায় কৃতানুবাদ, ২য় খন্ড, ১৬২৬ সং।
২। কার্জন পার্কে কালীমূর্তি উত্থানের চক্রান্তের সংবাদ প্রকাশিত হয় তদানীন্তন ‘ফরোয়ার্ড’, ‘বসুমতী’, বঙ্গবাসী’ প্রভৃতি পত্রিকায়। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ভুতপূর্ব সম্পাদক সতোন্দ্রনাথ মজুমদারের একটি রচনাতেও ছোলার বস্তার জুয়াচুরির কথা লেখা হয়েছিল।
কৃতজ্ঞতাস্বীকার:নন্দগোপাল সেনগুপ্ত।

সংগ্রাহক: পলাশ সরকার, শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চবি।