শুক্রবার, ১৫ মার্চ, ২০১৯

স্নিকারে লুকিয়ে থাকত খুর, কাঁধে গিটার — হাসনাত শোয়েব | স্মৃতিচারণ


অদ্ভুত সময় ছিল সেটা। জীবনের অন্যরকম একটা বাঁক। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। মিউজিক তো আগে থেকেই ছিল, এবার যুক্ত হলো মাস্তানিও। টানা দুই-আড়াই বছর এই মাস্তানির সঙ্গে ছিলাম। মারামারিও কম করিনি। এমনও হয়ছে মারামারি করে গিয়ে সিটি দিতে বসলাম। আবার মারামারি করে প্র্যাকটিস প্যাডে গিয়ে বাজাতাম। মনে আছে, স্নিকারে লুকিয়ে থাকত খুর, কাঁধে গিটার। কখনো ইউজ করিনি, কিন্তু রাখতে ভালো লাগত। নিজে থেকে প্রথমে কখনো কাউকে আঘাত করিনি। তবে জবাব দিতে দেরি করিনি। এমনও হয়েছে প্রতিপক্ষকে মারতে গিয়ে হকি স্টিক দিয়ে বন্ধু সায়েমের পিঠে বাড়ি দিয়েছিলাম। ওইটাই ছিল তার প্রথম ও শেষ মার খাওয়া। সায়েমের গিটারের ব্যাগে রড ও হকি স্টিক নিয়ে টেম্পু নিয়ে মারামারি করতে গিয়েছিলাম একবার।

হ্যা, সব যে ঠিক ছিল, তা না। যেভাবে মাস্তানিটা যেমন চেয়েছিলাম, তেমন হয় নাই বলে এক সময় বেরিয়ে এসেছি। অনেক কিছু মানিয়ে নিতে পারিনি। সবকিছু হয়তো ঠিক ছিল না। অনেককিছু না বুঝে করেছি। কিন্তু এটা ফ্যাক্ট। এটা ঘটেছিল। আমার লাইফের ওই সময়টা নিয়ে আমার কোন রিগ্রেট নাই এবং বেরিয়ে আসা নিয়েও নাই। সেটা একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ছিল। ওই সময়টাতেই আমরা রকস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, র‌্যাবো হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। হতে পারিনি, কিন্তু জার্নিটা অমূল্য।

লেখক:

হাসনাত শোয়েব
সাবেক শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান: ভিন্নভাবে দেখা – আবিদ খন্দকার | চলচ্চিত্র



“আমরা ভাই সাধারণ মানুষ! আমরা কি পারবো ওইরকম ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে?” এই প্রশ্নে ভীত হয়ে সরে আসা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম না। আমরা ছোট বেলায় গল্প শুনতাম, হাতি নাকি ওঁর বড় কানের জন্যে নিজের পুরো শরীর দেখতে পায়না। দেখতে পেলে নাকি হাতি আরও এলাহি কাণ্ড ঘটাত। মানুষও ঠিক তেমন। না, মানুষের অত বড় শরীর নেই। তাঁর আছে বুদ্ধি আর দল হয়ে উঠার ক্ষমতা। সংগঠিত দলীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের অজস্র জয়ের কাহিনী আছে। এই দুঃসময়ে সেই কাহিনী থেকেই অনুপ্রেরণা নেওয়ার সময়।

এমনই অনুপ্রেরণার উৎস কমিকসের চলচ্চিত্র ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান। চলচ্চিত্র বরাবরই মানুষকে শিখিয়ে এসেছে। নৈতিক অনৈতিক দুই দিক থেকেই। কিন্তু সুপার হিরোদের সিনেমায় জনগণের প্রেরণা কই? প্রেরণা আছে। অন্য সকল সুপার হিরো কাল্পনিক বিভিন্ন শক্তিসম্পন্ন বা এলিয়েন হলেও ব্যাটম্যান একজন মানুষ। বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। আর যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাহিনী নিয়ে এই চলচ্চিত্র তিনি সুপারম্যান। একজন ভীনগ্রহের প্রাণী।

ব্রুস ওয়েন গোথাম সিটির ধনাঢ্য ব্যক্তিত্য। মিলিটারি আর্মারের ব্যবসা করেন। আবার তার সৃষ্টি গোপন স্যুটের সাহায্যে হয়ে উঠেন ব্যাটম্যান। বিভিন্ন দুর্যোগ-আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন গোথাম সিটিকে। অপর দিকে পৃথিবীর বাইরের এক গ্রহের সর্বগ্রাসী যুদ্ধ থেকে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে এক দম্পতি পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়। ক্লার্ক কেন্ট নামে এক সাধারণ পরিবারেই বেড়ে উঠতে থাকে সেই সন্তান। ধীরে ধীরে তার অতি মানবিয় গুন প্রকাশ পেতে থাকে। একসময় মানব জাতিকে রক্ষা করতে নিজের পরিচয় গোপন রেখে হয়ে উঠে সুপারম্যান।

ব্যাটম্যান, সুপারম্যান দুজনেই দুজনের মতো করে মানব জাতিকে রক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু একসময় ব্যাটম্যান দেখলো, সুপারম্যানের শক্তির কাছে সাধারণ মানুষ অসহায়। সুপারম্যানের শক্তি কাজে লাগাতে তার স্বজাতিয়রা বারে বারে হানা দিতে লাগলো পৃথিবীতে। স্বাভাবিকভাবেই রাজায় রাজায় সেই যুদ্ধে প্রাণ গেলো শত শত উলুখাগড়া তথা মানুষের। ব্যাটম্যান বুঝে গেলো সুপারম্যানই সমস্যার মুলে। সেই যুদ্ধ ডেকে আনছে আবার সেটা থেকে রক্ষা করে হিরো হয়ে যাচ্ছে।

জনগণের নিজের শক্তির উপর আস্থা ফেরাতে, সুপারম্যানের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলো ব্যাটম্যান। প্রমাণ দিতে যে, সাধারণ মানুষের শক্তিই যথেষ্ট। কোন সুপারম্যানের দরকার নেই তাদের। একসময় দেখা যায় এই চলচ্চিত্রে ঠিকই জয়ী হয় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি ব্যাটম্যান।

সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হওয়ায় এখন আমেরিকার নিজের কোন সমকক্ষ শক্তি নেই বলেই মনে করে তারা। তাই আগে আমরা ভিয়েতনাম, কিউবা, চিন, রাশিয়া, জাপানের বিরুদ্ধে হলিউডি যুদ্ধ দেখতাম আর এখন তারা এই গ্রহ ছেড়ে ভিন্ন গ্রহের সাথে যুদ্ধ বাধায়। মানুষের সংগঠিত হবার শক্তি মেরে ফেলতে আর চূড়ান্ত ব্যক্তি কেন্দ্রিক করে তুলতে আমদানি হয় সুপার হিরোদের। আমরাও নিজেদের মনে বিশ্বাস করি, সুপার হিরোই তো চাই। এই দেশ এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে।

তারপরেও এই চলচ্চিত্র থেকে আমাদের শিক্ষা নেবার আছে। সাধারণ মানুষের শক্তি। মানুষই পারে নিজের ভাগ্য ফেরাতে। আমরা অনেক সময়েই ভাবি, কেউ যদি আমাদের সমাজের পরিবর্তন করে দিত! মনে রাখতে হবে আসল সমাজে কোন সুপারম্যান নেই। তাই বলে ভীত হবার কিছু নেই। সম্মিলিত মানুষের প্রচেষ্টার সামনে কোন বাধাই কিছুই না। সম্মিলিত হয়ে, সঙ্ঘবদ্ধ হলেই আমরা সবাই মিলে সুপার হিরো হতে পারি। আমাদের নিজেদের সমাজকে অসুন্দরের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। নিয়ে যেতে পারি প্রগতির দিকে।

লেখক:

আবিদ খন্দকার 
শিক্ষার্থী,অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ, ২০১৯

রহস্যময় ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ নিয়ে – মুন আর ক্যামেলিয়া | সঙ্গীত


জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ঈগলস’এর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান নিঃসন্দেহে “হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া”। এর লিড ভোকাল ডন হেনলি , লিড গিটারিষ্ট ডন ফেল্ডার আর গ্লেন ফ্রের (অ্যাকুষ্টিক ও ইলেকট্রিক গিটার, ব্যাকিং ভোকাল)। ছয় মিনিট আট সেকেন্ডের রক জেনারের এই গান রিলিজ হয় ১৯৭৭ সালে, অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাক । গানটার প্রাথমিক ডেমোর নাম দেয়া হয়েছিল 'Mexican Reggae' । গানের আইডিয়াটা সম্ভবত জেথ্রু টুল এর ‘উই ইউসড টু নো’ গানটা থেকে ঈগলসদের মাঝে আসে । গিটার সলো আর লিরিক দুটোই সুর আর শব্দের অদ্ভুত রসায়ন!

অ্যালবামের কভারে যে হোটেলটির ছবি ছাপা হয়, সেটি আসলে লস অ্যাঞ্জেলেসের বেভারলি হিলস্ হোটেল, যেটি পিঙ্ক প্যালেস নামেও পরিচিত । হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া বলে আদতে কোন হোটেল নেই । গানটা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের এক্সপ্লানেশন আছে । এর ইলাবোরেশনে এলেসডি, হিরোইন বা কোকেন অ্যাডিকশন কিংবা সাটানিজম কথা বলেছে ।

মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, মেনটাল হসপিটাল, গনিকালয় (Ceiling Mirrors কিংবা লাইব্রেরি এর কথাও এসেছে । এখানে ততকালীন মিউজিক ইন্ডাষ্ট্রিতে প্রচলিত প্রেমার্ত প্রেয়োবাদ বা ভোগবাদ, লোভ-লিপ্সা, সংস্কৃতির অতিরঞ্জন আর আত্মবিনাশ এইসব রুপকের আড়ালে ফুটে উঠেছে ।

ব্যান্ডদল: ঈগলস

লিরিক্সে শিরোনামটাকে একটা বিলাসবহুল ও জাঁকালো রিসর্ট হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে “you can check out anytime you like, but you can never leave."
গানটি শুরু হচ্ছে এভাবে:
“On a dark desert highway
Cool wind in my hair
Warm smell of colitas
Rising up through the air”

গানে ‘colitas’-এর উষ্ণ সুবাসের কথা আছে। এই স্পেনিশ টার্ম colitas (উচ্চারন koe-LIE-tis)। এর অর্থ ‘little tails’ যা মারিজুয়ানার মুকুলকে বুঝায় । তবে ইগলস এখানে ডিরেক্ট মারিজুয়ানা স্টিককেই বুঝিয়েছে, বুঝিয়েছে এর সৌরভকে । হাত বাড়ালেই মারিজুয়ানা, কোকেইন পাওয়া যায় ক্যালিফোর্নিয়ায়, এতটাই সহজলভ্য ।

আঁধার রাতের কোন বিজন রাজপথের কথা বলা হয়েছে এখানে। উত্তর-পশ্চিম মেক্সিকোর বেজা ক্যালিফোর্নিয়া নামক একটা পেনিন্সুলা বা বাইল্যান্ডে হতে পারে সেই স্থান । এই স্থানকে লিরিসিষ্টের কাছে মরুভুমির পাশে মরূদ্যান মনে হয়েছিল। গাড়িতে ছাদ নেই, খোলা আকাশ দেখা যাচ্ছে, ঝিরঝির বাতাস বইছে। এই অবস্থায় গাড়ি চালক মারিজুয়ানার স্টিক টানছিল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সেই ধোঁয়া: ‘my head grow heavy and my sight grow dimm’- মারিজুয়ানার ইফেক্ট ।

ক্যালিফোর্নিয়া আমেরিকানদের স্বপ্নের রাজ্য ‘Such a lovely place’ । রাজ্যের কলমায় স্বর্ণখনির উপস্থিতি থেকে ক্যালিফোর্নিয়া হয়ে Gold Rush এর শহর। অভাবনীয় বানিজ্যিক উত্তরনের হাওয়া লাগে লস এঞ্জেলেসের হলিউডে "Such a lovely face" । এখানে সবাই বুঁদ টাকার ঘোরে, নারীর লোভে, খ্যাতির মোহে—মানবীয় গুনাবলী অবলুপ্ত প্রায় । পপুলার কালচারে তাই ক্যালিফোর্নিয়া একটি হৃদয়হীন ফাঁদ — নন্দিত নরক ।

গানে বস্তুবাদকে ‘shimmering light’ (কম্পমান আলো) আর ‘She’-এর রুপকে উপস্থাপন করা হয়েছে । জীবিকা আর খ্যাতির সন্ধানে আসা অনেক মানুষের কাছে স্বপ্নগুলো মরীচিকাই থেকে যায় । তবে একবার এই লাল আলোর শহুরে জীবনে চলে এলে আর ফিরে যাওয়া নেই "we are programmed to receive”।

ভ্রমনকারী হোটেল ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছে গেলে- একজন রহস্যনারী সিডিউসিভ স্বরে তাকে অভ্যার্থনা জানায়, প্রলুব্ধ করে। গানের মুল চরিত্র হলো এই রহস্যনারী, ভ্রমনলণকারী হলো গল্পকথক । রহস্যনারীর বাঁকা চাহনি আর তীক্ষ্ণ চোখের চাবুক ভ্রমনকারীর লোহিতকণায় সৃষ্টি করে আন্দোলন ।

হোটেলে তখন শুরু হয়ে গেছে কোন এক অনুভূতিশূন্য প্রমত্তা ও বেপরোয়া উৎসব । অলঙ্কারশোভিত সুন্দরীদের অহমিকা, ঈর্ষাকাতরতা আর ধাতব হাসিতে ছড়িয়ে যায় যৌনতার মৌতাত । নেচে নেচে তারা সেই রাতের উৎসবকে স্মরনীয় করে রাখে । অনেকে বিষাদোতীত ভুলতে নেচে যায় । বারটেন্ডারের সার্ভ করা গোলাপি শ্যাম্পেন, ওয়াইন নৃত্যচ্ছন্দে যোগ করে ভিন্ন কোন তাল, লয় চিত্র ও ভাষা । যা এক সময় স্বপ্নীল, স্বর্গীয় বলে মনে হয়েছিল তা মুহুর্তেই ভৌতিক হররে পরিনত হয় । ডন হেনলি এখানে খুবই নাটকীয় ভাবে গানের গল্পের গতিপথে পরিবর্তনটা ফুটিয়ে তুলেছেন ।

অনেকের মতে হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া বলতে যে হোটেলকে বোঝানো হয়েছে সেটা আগে ছিলো একটা গীর্জা যেখানে স্যাটানিস্টরা উপাসনা করতো। স্যাটানিক বাইবেল লেখা হয় গানে উল্লেখিত ১৯৬৯ সালে। এই লিরেক্সে “Kill the beast” এবং “that spirit here”- এই দুইটা লাইন দিয়ে ব্লাক ম্যাজিকের প্রতি ইন্ডিকেট করা হয়েছে । ‘wine’ আর ‘spirit’ এখানে জেসাসের প্রতি নির্দেশ করে। এখানে মার্সিডিঞ্জ বেনযের পরিবর্তে উচ্চারিত ‘বেনড’শব্দটির অর্থ মানসিক ও শারীরিক অস্বস্তি, ‘টুইস্টেড’ বোধ।

আর গানটির এলবামের কভারের ভেতরের অংশে বিল্ডিং এর উপরের তলায় একটা ফিগার দেখা গিয়েছে, অনেকে বলছেন এটা এন্টন লেভীকে দেখা গিয়েছে যিনি প্রথম স্যাটানিক গীর্জা (হোটেল ক্যলিফোর্নিয়া) তৈরী করেছেন এবং তিনি হলিউডের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এর সাথে জড়িত ছিলেন । অ্যালবাম কভারের আর্ট ডিরেক্টর John Kosh ব্যালকনিতে একটা রহস্যজনক ফিগারের উপস্তিতি নিয়ে বলেন “হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া গানটাকে ক্যালিফোর্নিয়ার বোহেমিয়ান গ্রুভ নামের সিক্রেট স্যাটানিস্ট সোসাইটির মাইন্ড কন্ট্রোল প্রোগ্রামের অংশ বলা যেতে পারে।”

লেড জেপলিনের স্টিয়ারওয়ে টু হ্যাভেন-এর মতো হোটলে ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু অংশ ব্যাকমাস্কিং করা। এর মাধ্যমে কিছু সাটানিক ম্যাসেজ ইন্সার্ট করা হয়েছে। এ ধরণের মেসেজ আনকনসাস বিজ্ঞাপনের মনব  মনকে ইমপ্যাক্ট করে। সেক্ষেত্রে গানটাকে কোনো একটা রিচুয়ালে চলতে থাকা ঘটনাবলীর বিবরণ বলা যেতে পারে । আঁধারে থাকা ভ্রমনকারী “light bearer” লুসিফারের “shimmering light” দেখতে পায় আর সাটানিষ্ট কিংবা ইলুমিনিটিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রিচুয়ালের অদ্ভুত গন্ধ তাকে আকর্ষন করে।

হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া এখানে রিচুয়াল অনুষ্ঠানের বলরুম। “voices down that corridor” ভ্রমণকারীকে প্রলুব্ধ করে তাদের সিষ্টেমের প্রতি। “tiffany-twisted” “pretty boys” এই শব্দগুলো সেক্ষেত্রে রিচুয়ালে চলতে থাকা সডোম ও পেডোফিলিয়ার প্রতি ইংগিত দেয়। লুসিফারের “master’s chambers’ এ অনুষ্টিত হয় “feast of the beast”। “nightman” এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। প্রতিটা সদস্য আজীবন সদস্য হিসাবে শপথাবদ্ধ । জাঁকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে রয়েছে সমস্ত ভোগের উপাদান । তবে বিসংবাদী আর পলায়নপরদের এখানে অকাল্ট সেক্রিফাইস করা হয় । সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের কোন সুযোগ থাকে না।

তবে গানটার প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই যে, একই সমান্তরালে থাকা সব ইন্টারপ্রিটশনই গ্রহণযোগ্য ।


এই আর্টিকেলের তথ্যগুলো ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


বুধবার, ৬ মার্চ, ২০১৯

ইনসমনিয়া – সাফায়াত হিমেল | কবিতা


যখন রাতেরা আরো অন্ধকার হয়
অার চাঁদ ডুব দেয় অ্যালকোহলে
পাহাড় গড়িয়ে নিচে পড়তে
থাকে পাথর
বোবাভাষার ভেতর দিয়ে, চুপচাপ
এক অদ্ভুত ডিলিরিয়াম
অামাকে ঘিরে ধরে
এবং এইরকম একেকটা রাত
সহজে পার হয় না
যতক্ষণ নৈঃশব্দ্যের ধ্বনি
ইথারে ভাসতে থাকে

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

ওয়ান অফ দিজ ডেইজ - গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ | অনুবাদ: আবিদ খন্দকার



সোমবারের শুরুটা হলো মেঘমুক্ত নির্মল সকাল দিয়ে। এরিলো এস্কোবার ডিগ্রি ছাড়া দাঁতের ডাক্তার, সাতসকালে ঘুম থেকে ওঠা তার রোজকার অভ্যেস। সেদিনও তাই রোজকার মতোই সকাল ছয়টায় নিজের চেম্বার খুলেছিলো সে। চেম্বার খুলেই কাঁচের বাক্স থেকে নকল দাঁতগুলো নিয়ে কিছু অবশিষ্ট প্লাস্টার থেকে যাওয়া এক থালায় রাখলো। এরপর একগাদা যন্ত্রপাতি নিয়ে টেবিলের উপর আকার অনুযায়ী এমনভাবে সাজিয়ে রাখলো যেনো সেগুলোর প্রদর্শনী হচ্ছে। তার পরনে ছিলো ডোরাকাটা কলারবিহীন শার্ট, সোনালী রঙের গলাবন্ধনি আর সাস্‌পেন্ডার দিয়ে আটকে রাখা প্যান্ট। লোকটা দেখতে ঋজু আর রোগাটে। তাকানোর দৃষ্টি এমন যে বাস্তবতার সাথে কোনও সামঞ্জস্যই নেই, ঠিক যেমনটা কানে কালা লোকেরা তাকিয়ে থাকে।

জিনিসপত্র টেবিলে সাজানো হয়ে গেলে ড্রিল মেশিনটাকে টেনে টেবিলের কাছে নিয়ে এলো, তারপর নকল দাঁতগুলো পালিশ করতে শুরু করলো। কাজের রকম দেখে মনে হবে কাজে যেন ঠিক মন নেই কিন্তু আপনমনে ঠিকই কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো। ঠিকঠাক ড্রিলের প্যাডেলে পা চালাচ্ছিল, এমনকি অপ্রয়োজনের সময়েও।

আটটা বেজে গেলে আকাশ দেখার জন্য কাজ থামিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে একবার মুখ তুলে তাকালো। পাশের বাড়ির ছাদের খুঁটিতে বসে দুটো বাজপাখি গা শুকিয়ে নিচ্ছে। আকাশ দেখে দুপুরের পরে বৃষ্টি হতে পারে এই ভাবনা নিয়ে আবার কাজে মন দিলো সে। এই সময়ে তার এগারো বছরের ছেলের খনখনে চিৎকারে মনোযোগ ছুটলো।

‘বাবা।’
‘কী?’
‘মেয়র এসেছে। সে জিজ্ঞেস করছে তুমি তার দাঁত তুলে দেবে কিনা।’
‘তাকে বলে দে, আমি ঘরে নেই।’

সে একটা স্বর্ণের দাঁত পালিশ করছিলো। একসময় সে দাঁতকে কাঁধের সমান উচ্চতায় এনে এক চোখ বন্ধ করে অন্য চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেয়। বসার ঘর থেকে তার ছেলে আবার চেঁচিয়ে উঠে।

‘উনি বলছেন, তোমার শব্দ উনি শুনেছেন। তুমি আছো তা উনি জানেন।’

ছেলের কথায় কর্ণপাত না করে একমনে দাঁত পালিশ করা চালিয়ে যায় সে। ধীরেসুস্থে পালিশ করা শেষ করে টেবিলে সেটা নামিয়ে রেখে বলে উঠে –

‘বেশ তো!’

আবার সে ড্রিল চালাতে শুরু করলো। কার্ডবোর্ড থেকে পালিশ অসমাপ্ত কয়েকটা টুকরা তুলে নিয়ে সোনার দাঁতটিতে আবার মনোনিবেশ করলো।

‘বাবা!’
‘কী?’

তখনও তার চেহারার অভিব্যক্তির কোন পরিবর্তন হয়নি।
‘সে বলছে তুমি যদি তার দাঁত তুলে না দাও তবে সে তোমাকে গুলি করবে!’

কোনও রকম তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থিরভাবে ড্রিলের প্যাডেল থামালো সে, তারপর চেয়ার থেকে দূরে সরিয়ে রেখে টেবিলের সবথেকে নিচের ড্রয়ারটি খুললো। সেখানে রাখা আছে একটা রিভলভার। দেখে নিশ্চিত হয়ে সে বললো –

‘আচ্ছা তাকে এখানে এসে গুলি করতে বল।’

চেয়ার গড়িয়ে দরজার উল্টো দিকে নেয় সে, হাত তার স্থির থাকে ড্রয়ারে। দরজায় আবির্ভাব হয় মেয়রের। তার মুখের একদিকের দাড়ি কামানো আর অন্যদিক ব্যথায় ফুলে আছে, সেখানে পাঁচদিনের না কামানো দাড়ি। ডাক্তার লোকটার মুখে দেখতে পেলো অনেক রাতের যন্ত্রণায় ছাপ। আঙুলের ডগা দিয়ে ড্রয়ার বন্ধ করে মৃদু স্বরে বললো:

‘বসেন।’
‘শুভ সকাল,’ মেয়র বললো।
‘আপনাকেও,’ ডাক্তার উত্তর দেয়।

যন্ত্রপাতি গরম পানিতে জীবাণুমুক্ত করে নেওয়ার সময় মেয়র তার মাথা চেয়ারের শক্ত স্থানে হেলিয়ে দিয়ে বসে থাকে। এতে তার একটু আরাম বোধ হয়।

চেম্বারের চারিদিকে দৈন্য। পুরোনো কাঠের একটা চেয়ার, প্যাডেল দেওয়া ড্রিল আর সিরামিকের বোতল ভর্তি একটা কাচের তাক। চেয়ারের উল্টো দিকে একটা জানালা, তাতে কাঁধ সমান উঁচু পর্দা দেয়া। ডাক্তার আসছে আন্দাজ করে মেয়র গোড়ালি ফ্লোরের সাথে শক্ত করে এঁটে মুখ খুললো।

এরিলো এস্কোবার মেয়রের মাথাটি তুলে আলোর দিকে ফেরালো। আক্রান্ত দাঁত পরীক্ষা করে সতর্কভাবে আঙুলের চাপে মুখ বন্ধ করে দিলো।

‘অবশ না করেই দাঁত তুলতে হবে।’
‘কেন?’
‘কারণ মাড়ির গোঁড়ায় ফোঁড়া উঠেছে।’

মেয়র তার চোখের দিকে তাকালো। ‘ঠিক আছে,’ বলে সে একটু হাসতে চেষ্টা করলো। প্রত্যুত্তরে ডাক্তার হাসি না দিয়ে মুখ শক্ত করে রইলো। জীবাণুমুক্ত করে নেয়া যন্ত্রপাতির বেসিনটি টেনে কাজের টেবিলের কাছে নিয়ে এলো ডাক্তার, তারপর ঠাণ্ডা চিমটা দিয়ে সেগুলো তুলে নিলো। জুতোর ডগা দিয়ে থুকদানিটি ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বেসিনে হাত ধুতে গেলো সে। এই কাজগুলো করার সময়টাতে সে একবারও মেয়রের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি, অন্যদিকে মেয়রের চোখ প্রতি মুহূর্তে নিবন্ধিত ছিলো তার দিকে।

নিচের পাটির মাড়ির দাঁত আক্রান্ত। ডাক্তার পা ছড়িয়ে গরম চিমটা দিয়ে মেয়রের আক্রান্ত দাঁত চেপে ধরলো। মেয়র চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরলো, পায়ের গোড়ালি এঁটে বসলো ফ্লোরের সাথে আর প্রচণ্ড ব্যথায় কিডনিতে এক ঠাণ্ডা অসাড়তা অনুভব করলো। তীব্র যন্ত্রণাতেও সে টু শব্দটি করলো না। ডাক্তার কেবল তার কব্জি নাড়িয়েছে। কোন ক্ষোভ ছাড়াই থমথমে কিন্তু তিক্ত এক স্বরে সে বললো:

‘এখন আপনি দাম দেবেন আমাদের বিশজন ভাইয়ের খুনের।’

চোয়ালে সুতীব্র এক ব্যথায় মেয়রের চোখ পানিতে ছলছল করে উঠলো। কিন্তু দাঁত উঠে আসার আগ পর্যন্ত নিঃশ্বাস আটকে বসে থাকলো সে। তারপর অশ্রুর মধ্য দিয়ে সে দেখতে পেলো, এই ব্যথাটি এতোটাই তীব্র যে গত পাঁচদিনের ব্যথার তীব্রতা আর মনেই পড়ছিলো না।

থুকদানের দিকে ঝুঁকে পরে ঘামতে ঘামতে ঘন শ্বাস নিতে থাকে মেয়র। এরপর গায়ের টিউনিক খুলে নিয়ে পকেটে হাত দেয় রুমালের জন্য। এই দেখে ডাক্তার এক টুকরো পরিষ্কার কাপড় এগিয়ে দেয়।

‘চোখের পানি মুছে নেন,’ সে বলে।
মেয়র তাই করলো। সে কাঁপছিলো। ডাক্তার হাত দুয়ে নিচ্ছিলো, মেয়র তখন দেখছিল ক্ষয়ে যাওয়া সিলিং, ধুলো জমা একটা মাকড়সার জাল আর তাতে মাকড়সার ডিম, মৃত পোকামাকড়। ‘বাসায় গিয়ে শুয়ে পড়ুন আর লবণ পানি দিয়ে গড়গড়া করুন’, বলে ডাক্তার। মেয়র উঠে পড়ে। মিলিটারি কায়দার স্যালুট দিয়ে পা প্রসারিত করে টিউনিকের বোতাম না লাগিয়েই দরজার দিকে এগিয়ে যায় মেয়র।

‘হিসেবটা পাঠিয়ে দিও,’ সে বলে।
‘আপনার কাছে নাকি জনতার কাছে?’
মেয়র তার দিকে ফিরেও তাকায়না। দরজা বন্ধ করে দিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে বলে:
‘ধুর! দুইটা একই কথা’।

অনুবাদক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ।

দহন হাসান – মোহাম্মদ শাহরিয়ার | গল্প



আজ কিছুটা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে আনিস। ইদানীং তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে সে। এসে আরিফের পাশে বসে, তাকে গল্প শোনায়, মাথা টিপে দেয়। আরিফ এটা ওটা বায়না ধরে, বায়না ধরলে পূরণ করার চেষ্টা করে। আজ বায়না ধরেছিলো ইলিশ মাছ খাওয়ার, এই সময়ে তো সে আরিফের চাওয়া ফেলে দিতে পারে না। কষ্ট করে হলেও কিছু টাকা বাঁচিয়ে, সেই সাথে আরিফের মায়ের জমানো কিছু টাকা নিয়ে একটা মাঝারি সাইজের ইলিশ কিনে এনেছে।

আরিফের শুষ্ক চুলে আনমনে হাত বোলোচ্ছিলো আনিস।

"বাজান আমি ইস্কুলে কবে থেকে যামু"?
" এইতো বাজান সামনের মাস থেইকাই"
"এইখানে সারাদিন শুইয়া থাকতে ভাল্লাগে না। তুমি না কইছো ওষুধ খাইলে ভালো হইয়া যামু"
"হ বাজান, কদিন বাদেই ভালো হইয়া যাবি।
" আচ্ছা আমার কি অইছে? খালি মাথা ব্যথা করে ক্যান?

আনিস নির্বাক চেয়ে থাকে তার নিষ্পাপ ছেলের দিকে। মুখে কোনো কথা নেই। আরিফের ব্রেইন টিউমার। সবেমাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে, ব্রেইন টিউমার কী এটা বোঝার বয়স এখনো হয়নি। ইদানীং আরিফের মাথাব্যথাটা খুব বেড়েছে।যন্ত্রণায় ছটফট করে। ডাক্তার বলেছে দ্রুত অপারেশন করাতে হবে। বড়জোর চার সপ্তাহ অপেক্ষা করা যাবে। সে চিন্তায় গত কয়েকদিন ঘুম হয় না আনিসের। আরিফের মা মুখ লুকিয়ে কাঁদে। একমাত্র সন্তান তাদের। প্রায় আট লাখ টাকা দরকার।কোত্থেকে পাবে এতটাকা? হাজার সাতেক টাকা বেতনে গার্মেন্টসে চাকুরী করে। টানাটানির সংসার, দুহাজার টাকা ঘরভাড়া। ধারদেনা করে চলতে হয়,ওষুধ কেনার টাকা জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। জমিজমা নেই কিছুই,বসম্বল শুধু আরিফের মায়ের দুইভরি গয়না।বসেগুলো বিক্রি করেও তেমন লাভ নেই। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে আনিস।

পরদিন সকালে কাজে বের হলো সে। সামনে ঈদ। গার্মেন্টসে কাজের  চাপও বাড়ছে। কাজে মনযোগ নেই তার ।ওদিকে আরিফের সময় ঘনিয়ে আসছে। কোনো উপায় এখনো বের হয়নি। এত টাকা সাহায্য করার মতো লোকও নেই। মেশিনের গড়গড় শব্দে আনমনে কাজ করতে থাকে সে।

হঠাৎ চারপাশে মানুষের চিৎকার-চেচামেচি শোনা গেলো।পাশের রুম থেকে আগুনের প্রচণ্ড ধোঁয়া আসতে লাগলো।জীবন বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে সবাই এদিক-সেদিক ছুটছে।ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। আনিস দৌড়ে এগিয়ে গেলো। বাঁচার জন্য ভীড় ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও হঠাৎ কী ভেবে পেছনে ফিরে এলো। কোনোরকম বাঁচার চেষ্টা করলো না। এলোমেলো ভাবছে সে। আট লাখ টাকা... শ্রমিকের জীবনের মূল্য বেশি না হলেও অন্তত চার -পাঁচ লাখ টাকা তো অনুদান মিলতে পারে। তার আদরের আরিফের একটা ব্যবস্থা তো হতে পারে...

দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে আনিসের দেহ। সে সঙ্গে তার স্বপ্নও হয়তো!

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

জাক লাকাঁর ভাষাচিন্তা – নূরে এলাহী শাফাত | দর্শন



বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ চষে বেড়ানোর নানা ক্ষেত্রে, বর্গ, পরিসীমা আছে। এসব ভাণ্ডারকে কেউ আলোড়িত করেছেন দর্শন দ্বারা, কোনো কোনো চিন্তক তাতে যোগ করেছেন ইতিহাস, নৃতত্ত্ব কিংবা ধর্মতত্ত্বকে। ফরাসি ভাবুক জাক লাকাঁ হচ্ছেন সেই মনীষা যিনি তার চিন্তার জমিনকে ভাষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কাঠামোগত ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত লাকাঁর আধুনিক সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ-আগ্রহ ছিল। লাকাঁর ভাষাদর্শন চিন্তার একটা জটিল খোলস বেশ আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। তথাপি ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাক লাকাঁর গদ্যের দুরূহতা সত্ত্বেও তার চিন্তায় এমন কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে যার সাথে দর্শনের সরাসরি সম্পর্ক আছে, যা কিনা উত্তরাধুনিক সাহিত্যের সাথে অন্তরঙ্গভাবে জড়িত।

লাকাঁ পাঠের আগে আমাদের বুঝতে হবে ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণের অনুপুঙ্খ ধারনা, কারণ লাকাঁনীয় ভাষাচিন্তার মর্মশাঁসে যার ভাবনা জড়িয়ে আছে, তিনি ইয়োরোপের বিখ্যাত মনোদার্শনিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। যেমন মার্ক্স বোঝার আগে আমাদের ফয়েরবাখ বুঝতে হয়, আবার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বোঝার জন্য আমাদের তাকাতে হয় হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক ভাববাদের দিকে।

লাকাঁ মানুষী চেতনার বস্তুগত সমস্যাগুলোকে সবসময় মোকাবেলা করেছেন, যেগুলো প্রায় সর্বাংশেই দার্শনিক ব্যাবস্থার সাথে সম্পর্কিত। তাঁর মূল প্রসঙ্গই যেহেতু মানুষের ভাষা, সে জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি আবিষ্কার করেন তামাম প্রাণীকুল থেকে মানুষের আশরাফুল মাখলুকাত হওয়ার কারণ- মানুষের ভাষা আছে এবং তা দিয়ে সে কথা বলতে পারে। এজন্যই দার্শনিক লাকাঁ তার উদ্ভাবিত মন, মনস্তত্ত্ব ও মনোসমীক্ষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মানুষী ভাষার উপর, কারণ ভাষা ছাড়া চিন্তাজগত ও তার প্রকাশ অসম্ভব। ভাষা ব্যতিরেকে মানুষের অভিজ্ঞাতলাভ ‘অভিজ্ঞতা’ হয়ে ওঠে না। একজন বোবা মানুষ ভাষা বোঝে, সেই বোঝার ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট বোঝাপড়াও আছে। কিন্তু সমাজে যখনই সে তার বোঝার অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে অসমর্থ, তখনই শোনার ভেতর দিয়ে বোবা ব্যক্তিটির ভাষিক অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতা-সংশ্লিষ্ট হয়ে ওঠে না। এজন্য জাক লাকাঁ চিন্তা, ভাষা ও অভিজ্ঞতাকে কখনো এক করে দেখেননি।

শিশু খুব দুষ্টুমি করছে। তার মা তাকে বকা দিয়ে বলছে, ‘তোর বাবা আসলে মজা দেখবি’। মায়ের একথা শুনেই শিশুটি শান্ত হয়ে গেল। প্রশ্ন আসে, "মজা দেখবি" শাব্দিক ও বাক্যার্থে ইতিবাচক হলেও তার মধ্যে যে ভয়াবহতার ইঙ্গিত আছে শিশুটি তা বুঝল কীভাবে? এখানে, মায়ের চেহারা, অভিব্যক্তিই শিশুটিকে ভীত করে। ফলে মায়ের "মজা দেখবি"কে সে আগত হুশিয়ারবার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যার সাথে শিশুর ভাষা বোঝার অভিজ্ঞতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মানুষ ছাড়া অন্যান্য সব প্রাণী প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত, তাড়িত। তাই সেসব প্রাণীর পক্ষে কোনো অভিজ্ঞতা কিংবা স্মৃতি আঁকড়ে ধরা সম্ভব হয় না।

লাকাঁ বলেছেন, ভাষাবিনা নামকরণ সম্ভব হয় না। সম্বন্ধ এবং আত্মীয়তার যে ধারনা তা ভাষাগতভাবেই নির্মিতি লাভ করে এবং অর্থবোধক হয়। কাকা, খালা, মামাতো বোন, স্ত্রী, ভাতিজা ইত্যাকার নাম ভাষার ভেতর দিয়েই ফলপ্রসূ হয়। ফলে এসব সম্পর্কই আমাদের নামকরণের মধ্য দিয়ে বলে দেয় কাকে সম্মান করতে হবে, আর কাকে স্নেহ করব, কার সাথে যৌনসংগম করব অন্যদিকে কার সাথে যৌনাভূতিও প্রকাশ করা যাবে না। আমরা যখন গল্প, কবিতা, উপন্যাস পড়ি তখন সেখানে ভাষা ব্যবহারের প্রয়োগের ব্যবস্থাপনা সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রকে ঔজ্জ্বল্য প্রদান করে, কিন্তু কীভাবে? যখন "সর্বহারার শ্রেণীসংগ্রাম" বলা হয় তখন কমিউনিজমের কথাই আমাদের মাথায় আসে, পক্ষান্তরে "মজলুমের জেহাদ"বললে আমরা ইসলামী মতাদর্শের অস্তিত্ব পাই। কাজেই ধর্ম, জাতি, সংবিধান, বাহিনী, মতবাদ ও রাষ্ট্রের নানান অবস্থান ও তার দৃষ্টিকে ভাষার মাধ্যমেই আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি। এবং সে সংজ্ঞার ভেতর দিয়ে আমরা জগৎ-জীবন ও সাহিত্যের সমাজকে।  যখন আমরা "নারী" উচ্চারণ করি, তখন নারীর শরীরী অস্তিত্ব সবার সামনে উদ্ভাসিত হয়, তার প্রধান কারণ নারীর লিঙ্গীয় ধারনা: যে কথা বলবে কোমলভাবে, রান্না সুস্বাদু হবে, ঘর সংসার করবে। অন্যদিকে যখন উচ্চারণ করি "পুরুষ", তখন তার লিঙ্গীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ভাবি তার শরীর কোমল নয়, চেহারা তেমন সুন্দর নয়, মাঠে কিংবা কর্মক্ষেত্রে তার অবস্থান থাকে। উপরের কথাগুলো নির্দিষ্ট সমাজের অবস্থানের কারণে বলা, যাকে আমরা ভাষার উসিলায় হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হই।

লাকাঁর মতে ভাষার লিঙ্গ, ভূগোল, সমাজ, রাজনীতি, মন আছে। আছে ভাষার বহুমাত্রিক জবান। কাজেই ভাষা একবাচনিক (singular) নয় বরং বহুরঙের, বহুবচনের। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে কোনো হোটেলবয়কে পুরী আনতে বললে সে আটা দিয়ে বানানো, ফোলানো খাবার নিয়ে আসবে। পক্ষান্তরে সিলেটের কোনো জনরাস্তায় বন্ধুকে "পুরী খেতে ইচ্ছে হচ্ছে" বললে আশপাশের মানুষ ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকাবে। কারণ সিলেটে পুরী মানে মেয়ে। মোটাদাগে এটাকেই বলা যায় ভাষার স্থানিক রূপ। এটাই লাকাঁর ভৌগলিক ভাষা।

জড়বাদী লাকাঁ ভাষার মিস্টিসিজমকে অস্বীকার করেছিলেন এবং ভাষার রুহানিয়াত (ভাব) বিরোধী সাহিত্য আন্দোলনকে ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সাহিত্যে, ভাষায় লাকাঁর এই ভাববিরোধী সংগ্রাম বুঝতে হলে আরেক ফরাসি চিন্তক জাক দেরিদার অধিবিদ্যাবিরোধী ভাষিক আন্দোলনকেও বোঝা দরকার। লাকাঁ দেখান, রেনেসাঁর শুরু থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইউরোপীয় সমাজে যতগুলো দর্শন ও ভাষা সাহিত্য তৈরী হয়েছে তার অন্তর্মূলে ভাববাদী চেতনা প্রখর ছিল, যা মানুষের অস্তিত্ববাদী ধারনাকে ভাবভাষার বেড়াজালে ধূসর করে তোলে। তাই গ্রিক পুরাণের নামে, প্রকৃতিবাদের নামে, ইউরোপীয় মানবতাবাদী সমাজে যেসব জ্ঞানভাণ্ডার, দর্শন ও ভাষা তৈরি হয়েছে তার মধ্যে ভাবের (অ-বস্তুবাদ) উপস্থিতির কারণে জড়বাদী লাকাঁ এয়াব সৃষ্টির বিরুদ্ধে ভাষিক বিপ্লবের ডাক দেন।  এই ভাষাগত চিন্তার পাটাতনে দাঁড়িয়ে সমস্ত ধর্মীয়, মানবতাবাদী ভাষাকে লাকাঁ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। সেই দিক থেকে জাক লাকাঁর ভাষাচিন্তাকে নিরীশ্বরবাদের দিকে অগ্রসর হতে দেখা যায়।

ভাষা আর সাহিত্য যেহেতু পরস্পর অবিচ্ছেদ্য, তাই সাহিত্যের গভীর বোধ ও তার চাষাবাদের জন্য সাহিত্যশীল মানসকে জাক লাকাঁর ভাষাদর্শনের দিকে তাকাতেই হয়। বিশেষ করে আধুনিক ও উত্তরাধুনিক সাহিত্যের বাঁক এবং বৈপরীত্যের দার্শনিক উৎকর্ষতা সম্পর্কে চিন্তা করতে হলে লাকানীয় দর্শনের পাঠ নিতে হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লাকাঁর ভাষাচিন্তা দর্শন ও সাহিত্যবোধের বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতকে একই সুতোয় গেঁথেছে। এমন না যে লাকাঁর ভাষাদর্শনের বোধের উপর সাহিত্য ও সাহিত্যমনকে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে লাকাঁর ভাষাচিন্তা সাহিত্যের জমিনকে অনেক বেশি পরিগঠিত করে তোলে।

লেখক: শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

স্বীকারোক্তি - শরীফুল আলম | কবিতা



এই স্বীকারোক্তি বড় সহজ
নিজেকে একা প্রমাণ করা

শুনেছি সেলফ্ কেলকোলেশন
বড় নিষ্ঠুর হয়
মৃত বলে রায় দেয়
একে একে সবাইকে

একচোখা দাঁড়কাক
পাশেই ভিক্ষুক
একটা ভাঙা মসজিদ
আপনি শুধু কল্পনার পর
কল্পনা করে যান

এক সন্ধ্যায় কোন এলোকেশী
প্রেমিকা হতে চাইলে, বড় হাসি পায়।
ইচ্ছে করে পাজর খুলে মিলিয়ে দেখি
কার চোখ কতো নীল
কে কতো বিষাদের বিষে উল্লাসিত
কার ভিতরটা কতো লাল
থকথকে ভালোবাসা নিয়ে
কে কতো বেশি পরিপূর্ণ।

আমি সেদিনও ঈশ্বরকে বলছিলাম,
আমায় মুক্তি দিন
আমি জীবনের কাছে পরাজিত নই,
বরং একটু বেশিই স্বাধীন।
উনি হাসলেন।
আবারো বললাম,
অথবা দান কোরে দিতে পারেন আমাকে
একটি প্রাণ আমার বদলে
কোন আধমরা বৃক্ষকে।

পৃথিবী বাঁচুক
এই একা থাকা প্রাণগুলো নিয়ে
বরং একা থাকার চেয়ে
বৃক্ষ হয়ে বাঁচা ভালো বলে...

লেখক: শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ (৩য় বর্ষ), চবি।

আয়নায় বন্ধুর মুখ - অপরাহ্ণ সুসমিতো | কবিতা



মধ্যরাতে শিস শুনে জানালা খুলে দেয় ইস্কুলের খাতা থেকে মুখ বের করা কিশোরী ।
পাহড়ের ঢালু পথ বেয়ে নেমে যায় কতিপয় যুবক । ময়লা জিন্স ।

কালু'র কটেজ থেকে নেমে পড়ে গোপন যুবকেরা । চিৎকার করে ওঠে : দুই মলাটের ভাজ থেকে নেমে এসেছে কবিতা মাতাল, গোলগাল চাঁদ । তরবারী'র মতো নিষিদ্ধ সিগারেট ।
কালু'র কটেজ ঠায় দাঁড়িয়ে খলবল চন্দ্রঘোনা ।

বড় হতে হতে এত বড় হয়েছি, আর বড় হতে চাই না । সেই কবে নিশি রাত, দূর পাল্লার ঢালু পথ, হাউজ-দ্যাট বলে চিৎকার করে ওঠা খটখটে দুপুর, দোতলা'র জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দেয়া মেয়েটা'র চিঠি, অসহ্য সবুজ নদী-পাড় রাবার বাগান ।

টগবগ করতে করতে বন্ধুসভা কর্ণফুলীতে সাম্পান ভাসায় । চাঁদ নেমে আসে কনকের মুখে । হারমোনিকা বাজাতে বাজাতে লাতু ডাক দেয়;

: স্কুবিডুউউউউউউ ।

কাশেম বা ফুজু বা ফর্সা বাবুল  হেঁটে যায় কাপ্তাই থেকে দূরের বরইছড়ি । জসীম শেরুকে বলুক আজ : স্বপন, জীবনের উপপাদ্য অন্যরকম ।

কী আশ্চর্য আজ বন্ধুতার থিয়েটার !

আজিম, তুই ওখানে সটান বসে থাক । নড়বি না এক পা । আমরা তো আসবো । খবরদার তুই আমাদের মতো বুড়ো হবি না । গোলগাল ঠান্ডা চাঁদের প্রণয় তোকে দিলাম ।

আয় নিয়ে যা, আজিম।

বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’র গল্প - তাবাসসুম ফাতেমা | প্রবন্ধ



‘কবিতাকে যথোচিত গৌরবে বিশেষভাবে ছেপে থাকে এমন সাময়িকপত্র বর্তমানে দেশে বেশি নেই। অথচ আধুনিক কবিদের অনেকেই নতুন কবিতা লিখছেন, বাইরের পাঠকমণ্ডলী দূরে থাক, অনেক সময় নিজেদের মধ্যে সেগুলো দেখাশোনার সুবিধে হয় না। এই কারণে আমরা একটি ত্রৈমাসিক কবিতাপত্র বার করতে বাধ্য হচ্ছি। পত্রিকার নাম হবে ‘কবিতা’ এবং তাতে থাকবে শুধু কবিতা।’

এটি ১৯৩৫ সালে কলকাতার সাহিত্যপত্রিকা বিচিত্রায় প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপন। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, "কলকাতায় ভালো পত্রিকা অনেক ছিল, কিন্তু এমন কোনো পত্রিকা ছিল না যার মধ্য দিয়ে কবিতা হতে পারে বিশেষভাবে প্রকাশিত, প্রচারিত ও রসজ্ঞানের দৃষ্টিগোচর"। সে সময়ে উল্লেখযোগ্য কিছু পত্রিকা ছিল সবুজপত্র, কল্লোল, পরিচয় ইত্যাদি। কিন্তু এগুলো ছিল রবীন্দ্রনির্ভর। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবশালী বলয় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সেই তিরিশের দশকে যেসব কবি সংগ্রাম করেছেন, তাদেরকে 'প্রোমোট' করার মতো কোনো প্লাটফর্ম ছিল না। আধুনিক কবি বুদ্ধদেব বসু এই অভাব তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন।

সাহিত্যপত্রিকাকে ঘিরে আড্ডার ঐতিহ্য বাংলায় সবসময়ই ছিল। ‘পরিচয়’ পত্রিকার এক আড্ডায় কবি অন্নদাশংকর রায়ের হাতে "পোয়েট্রি" নামের এক ইংরেজি পত্রিকা দেখলেন বুদ্ধদেব বসু। তখনই তাঁর মাথায় কেবল কবিতাকেন্দ্রিক একটি পত্রিকা করার ভাবনা এলো। পোয়েট্রি'র অনুকরণে তিনি সে পত্রিকার নাম রাখলেন ‘কবিতা’। ত্রৈমাসিক এ পত্রিকায় ছাপানো হবে কবিতা, কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ, সমালোচনা ইত্যাদি।

এর আগে বুদ্ধদেব হাতে লেখা কাগজ পতাকা, ক্ষণিকা এবং মাসিক প্রগতির সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এবারের কাজটা ছিল সম্পূর্ণ নতুন এবং অনেকটা কঠিনও। অর্থের প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত হলো চাঁদা তোলা হবে। কবি'র স্ত্রী প্রতিভা বসু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘প্রথম চাঁদাটা যে আমিই তুলেছিলাম সেটা ভুলিনি। ...চাঁদার হার পাঁচ টাকা। বুদ্ধদেব পাঁচ টাকা, প্রেমেন্দ্র মিত্র পাঁচ টাকা, মায়া মাসিমা পাঁচ টাকা, পনেরো টাকা তো উঠেই গেল। কী ফূর্তি সকলের। বাড়ি ভেসে গেল খুশির জোয়ারে।...শেষ পর্যন্ত পয়ত্রিশ টাকা চাঁদা উঠতেই শুরু হয়ে গেল কাজ।’ এসময়ে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদনার কাজে প্রেমেন্দ্র মিত্রকে পেয়ে গেলেন। পূর্বাশা প্রেস থেকে ছাপানো হলো প্রথম সংখ্যাটি। সৌভাগ্যের বিষয়, প্রেসের মালিক কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য ছাপানোর কাজটি বিনামূল্যেই করে দিলেন। ১৯৪৫ সালের পহেলা অক্টোবরে প্রকাশিত হলো ‘কবিতা’র প্রথম সংখ্যা। শুরু হলো আধুনিক কবিতার প্রথম ও প্রধান মুখপাত্র'র সাহিত্যযাত্রা।

এ পত্রিকা বেশ সাড়া জাগাতে পারল। আলোচনা-সমালোচনা চলতে লাগল। এক কপি কবিতা'র দাম ছয় আনা, বার্ষিক দেড় টাকা। প্রথম বছরেই এর গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়াল সত্তরে। দু' বছর না যেতেই প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদনা থেকে সরে গেলেন। বুদ্ধদেব একাই টেনে নিতে লাগলেন কবিতাকে। টানা ২৫ বছর এই পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়। সেই তিরিশের দশকের পঞ্চপাণ্ডবের সকলেই এ পত্রিকায় লিখতেন। বুদ্ধদেব তাঁদেরকে নিয়ে আধুনিক কবিতার আন্দোলনকে সংহত করেন। বাংলা সাহিত্যে এ পত্রিকার অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এখানে কবিতা ছাপা হওয়া মানেই যেন কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাওয়া। কবিতা'র নিরপেক্ষতাও ছিল অসাধারণ। বুদ্ধদেব বসু থেকে ভিন্ন ধারার কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা বের হয়েছিল। শুধু কবিতার খাতিরেই, সাহিত্য আর রাজনীতিতে বিপরীতে মেরুর লোক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাও এখানে গুরত্ব পেত। মোট ৩৪৫ জন লেখক এখানে লেখেন। এর মধ্যে পূর্বোক্ত কবিগণসহ উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, সমর সেন, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ।

এঁদের মধ্যে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয় জীবনানন্দ দাশের কথা। জীবনানন্দ যখন রবীন্দ্রনাথসহ সমকালীন সকলের কাছে অবহেলিত, তখন এগিয়ে এলেন বুদ্ধদেব বসু।  জীবনানন্দের জীবদ্দশায় মাত্র ১৬৭টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল, যার ৯৭টিই ছিল কবিতায় প্রকাশিত। তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনাও ছাপা হতো এ পত্রিকায়। বাংলায় নতুন ধরণের কবিতা লিখতে থাকা জীবনানন্দকে সব নিন্দা-সমালোচনা আর তাচ্ছিল্য থেকে রক্ষার দায়িত্ব বুদ্ধদেব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কবিতা'র আর সব কীর্তি বাদ দিলেও, জীবনানন্দকে তুলে ধরা, তাঁর মৃত্যুর পর জীবনানন্দ সংখ্যা প্রকাশের জন্যও পত্রিকাটি অমর হয়ে থাকবে।

বুদ্ধদেব বসু কবিতা'র প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পর সভয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক কপি পাঠিয়েছিলেন, এবং একটা লেখা প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বিশ্বকবি তাঁদের পত্রিকার জন্য একটি কবিতা পাঠিয়েছেন। সাথে প্রশংসাসূচক মন্তব্যও, ‘‘তোমাদের ‘কবিতা’ পত্রিকাটি পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি। এর প্রায় প্রত্যেকটি রচনার মধ্যেই বৈশিষ্ট্য আছে। সাহিত্য-বারোয়ারি দল-বাঁধা লেখার মতো হয়নি। ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে এরা নূতন পরিচয় স্থাপন করেছে।’’

বাংলা সাহিত্যে আহসান হাবীবের মতো উল্লেখযোগ্য সম্পাদকও এসেছেন। অনেক সাহিত্য-পত্রিকা, লিটলম্যাগ ইত্যাদি এসেছে। বর্তমানে অনলাইনে সাহিত্যচর্চার চল শুরু হওয়ার পরেও এসবের আবেদন এখনো দৃশ্যমান। এসব পত্রিকার আদর্শ হয়ে থাকবে ‘কবিতা’। অনুকরণীয় সম্পাদক হিসেবে সবার আগে ঢাকার ছেলে বুদ্ধদেব বসুরই নাম আসবে।

লেখক:
তাবাসসুম ফাতেমা
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ।

কাম - সায়ান তানভী



মেয়েটার সাথে আমার যৌন সম্পর্ক ছিল প্রায় দেড় বছরের, তবে তা বিবাহ বহির্ভূত ছিল না, আমরা গোপনে বিয়ে করেছিলাম। যদিও বিয়ে নিয়ে আমি বেশি স্পর্শকাতর নই, তবে জেরিন ছিল অতিমাত্রায় সংস্কার আক্রান্ত, সে কোনভাবেই সার্টিফিকেট ছাড়া সেক্স করতে রাজি ছিল না। আমি কেবল ওর সাথে এক বিছানায় শুতে উদগ্রীব ছিলাম, শর্ত কোন বিষয়ই নয় সেক্ষেত্রে। আমরা তাড়াতাড়িই বিয়ের ঝামেলা শেষ করলাম। সব হয়েছিল জেরিনের পরিকল্পনা মতো, আমি কথা দিলাম দুই বছর পর স্বেচ্ছায় তাকে ডিভোর্স দিবো, এরপর সে তার বহুদিনের প্রেমিককে বিয়ে করবে।

এটা আগাগোড়াই একটা চমকপ্রদ প্রস্তাব ছিল আমার জন্য । আমার তখন কিছু বান্ধবী থাকলেও এমন কেউ ছিল না যার সঙ্গে এক বিছানায় শোয়া যায়, শরীর দেখা যায় যার আদ্যোপান্ত, শরীরের মাতাল করা ঘ্রাণ শোঁকা যায় অবিরত। এটা নিয়ে প্রায়ই মনস্তাপে ভুগতাম আমি । মাঝে মাঝে ইচ্ছা হতো গণিকালয়ে যাই, তবে সাহস হয় নি কখনো । অবশ্য পরিচ্ছন্ন বেশ্যাদের স্তন চোষার মতো পর্যাপ্ত অর্থও আমার ছিল না । কিন্তু জেরিনও যে আমার মতো দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে, তথ্যটা একটু অবাক করার মতোই ছিল । আমরা সবাই জানতাম জেরিন ফোর্থ ইয়ারের একটা ছেলের সাথে প্রেম করছে । বেশ ভালো ছেলে, সামাজিক আর আনুষ্ঠানিক ধাঁচের। একটু হয়তো নির্বোধ, তবে ওদের প্রেমটা বেশ দৃঢ়ই ছিল, দীর্ঘ দিনের, পারিবারিকভাবেও স্বীকৃত, আমরা এমনই জানতাম ।
জেরিন জানত আমার কোন প্রেমিকা ছিল না আর আমি চালচুলোহীন, আমার অর্থকষ্টও ছিল । যে কোন কারণেই হোক, আমাকে হয়তো তার নির্ভরযোগ্য আর জটিলতাহীন মনে হয়েছিল । সে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছিল অল্প কয়েকদিনেই ।

পলিফোনিক রিংটোনের একটা সস্তা ফোন ছিল তখন আমার, ঐ ফোনে টাকা থাকতো না কখনোই । ব্যালেন্স শূন্য ফোনে কেউ কল করার প্রয়োজন বোধ করে না, কিন্তু জেরিন আচমকাই অনবরত ফোন করা শুরু করে । আমি ছিলাম মহা অব্যস্ত মানুষ, আমার ছিল অফুরন্ত সময় । বিদ্যুতের তারে বসে থাকা কাক, ড্রেনের জলে ভেসে চলা রঙ্গিন চকচকে পলিথিনের ব্যাগ আর ভাঙ্গা এবড়ো থেবড়ো রাস্তার উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়া কুকুর দেখেই আমি বেশিরভাগ সময় কাটাতাম।
জেরিন তার উদ্দেশ্য জানাতে খুব দেরি করে নি । যদিও ব্যাপারটা আমাকে ভাবাচ্ছিল। আমি সন্দেহপ্রবন আর সতর্ক মানুষ, তাই জেরিন যেদিন অতি গোপনীয় প্রস্তাবটা দিলো, সহসাই আশংকামুক্ত হলাম, অবাক তো অবশ্যই ।

জেরিন অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের মেয়ে ছিল, রক্ষণশীলও বলা যায় কিছুটা । তাকে ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের সংস্কার গুলে খাওয়ানো হয়েছে । যদিও সামনাসামনি যখন কথা বলতাম কিংবা দেখতাম ওকে কাছ থেকে, বেশ জড়সড় আর দ্বিধান্বিত লাগতো। অথচ ফোনে জেরিনকে মনে হতো অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, অকপট আর বুদ্ধিমান । মেয়েটাকে পছন্দ না করার কোন কারন ছিল না । হিজাব পরতো সে ঢোলা সৌদি বোরখার সাথে । তার অনিন্দ্য কমনীয় মুখ আর বিস্ময়কর নীল চোখই যথেষ্ট ছিল যে কাউকে মোহান্ধ করতে কিংবা গোলাপি বাঁকা চাঁদের মতো ঠোঁট।

আমরা ঠিক করলাম আমাদের একান্তে কথা বলা উচিত কোন নিরব অথবা নির্জন জায়গায় । এক মঙ্গলবার আমরা ক্লাসে না গিয়ে কাপ্তাই লেকে গেলাম । বর্ষার জলে লেকটা থই থই করছিল। লেকের জলে কয়েকটা রাজহাঁস আর একটা শিয়াল ভাসছিল । আমি জেরিনকে বললাম তোমার তো প্রেমিক আছে, যার সাথে তোমার বিয়েও ঠিক হয়ে আছে, তবু কেন আমার প্রেমিকা হতে চাইছো ।
- আমি ওকেই বিয়ে করবো, তাকে ভালবাসি আমি, সে নিরীহ আর সৎ । এদের সঙ্গে নির্ঝঞ্ঝাটে পৃথিবীতে থাকার সময়টা কাঁটিয়ে দেয়া যায় । কিন্তু সে অতিমাত্রায় ধার্মিক, ভীতুও, অবশ্য আমিও বোরখা পরি, নামাজ পড়ি নিয়মিত । জেরিন এরপর একটু থেমে নিচু আর স্পষ্ট গলায় বলল, তুমি হয়তো বাগাড়ম্বর ভাববে, তবে এটা সত্য। বহু শব্দহীন রাত আমি না ঘুমিয়ে কাটাতে বাধ্য হচ্ছি । আমার পুরো শরীর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠে, সারা শরীরে বর্ণনাতীত যন্ত্রণা । এভাবেই কাটছে অজস্র দীর্ঘ রাত, শীতল নিস্তব্ধ ভোর, নির্জন দুপুর আর বিষণ্ণ আবছা গোধূলি । মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থ মনে হয় নিজেকে । তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো আমার ব্যাপারটা। আমি যতদূর জানি মেয়েরা তোমাকে পছন্দ করে না, তোমার আশে পাশে ঘেঁষে না । তুমিও আমার মতো তৃষ্ণার্ত আর বুভুক্ষ ।
- এটা আসলেই ভয়াবহ, শরীর কিংবা মন, দুটোর জন্যই।
- আমি মহসিনকে অসংখ্যবার বলেছি, সে বিয়ের আগে সেক্স করতে কোনভাবেই রাজি নয়, এমনকি গোপনে বিয়েও সে করবে না । আমি বহুভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি, আমার ভাবতে কষ্ট হয়, আমি তাকে ভালবাসি, তাকে ঠকাতে চাই না আমি । অথচ পৃথিবী সরল নয়, চাইলেও এখানে কেউ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না ।
- এখন কি করবে ভাবছো ।
- আমরা গোপনে বিয়ে করবো যদি তুমি রাজি থাকো । দুই বছরের জন্য । এরপর তুমি আমাকে ডিভোর্স দেবে । সারা জীবনের জন্য চাপা পড়ে যাবে এই দুই বছর ।

প্রায় দেড় বছর সব ঠিকঠাকই চলেছে । আমরা সুযোগ পেলেই সবার আড়ালে চলে যেতাম শহর ছেড়ে, সারাদিনের জন্য রাঙ্গামাটি, নীলগিরি অথবা কলাতলী সমুদ্র পাড়ের কোন হোটেলে । আমরা অবিরাম সেক্স করতাম আর সমুদ্রের নীল জলে ভিজতাম । অদ্ভুত উদ্দাম একটা সময় ছিল সেটা । আমি যেন কল্প জগতে ভাসছিলাম, আমার অর্থাভাবও কেটে গেছিল । জেরিন আমাকে প্রচুর টাকা দিতো । সময়টা ছিল আনন্দের-সুখের, আমি অনেক ভালো বোধ করতাম ঐ সময়টায়, রাতে এবং দিনে, আমার কোন দুঃখবোধ ছিল না তখন ।
কিন্তু সুসময় সম্ভবত ধরে রাখা যায় না দীর্ঘ দিন, ফুরিয়ে যায় কল্পনার চেয়েও দ্রুত। একদিন হঠাৎই আমার ঘোর কাটল। জেরিন আমাকে বলল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডিভোর্সের যাবতীয় কাজ সেরে ফেলতে। সে তার বহু বছরের প্রেমিককে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করতে যাচ্ছে । যদিও ব্যাপারটা ঘটারই কথা ছিল, তবু অকল্পনীয় আর অসম্ভব মনে হচ্ছিলো সবকিছু । আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম কিছু মুহূর্তের জন্য, সবকিছু যেন থমকে গেলো আচমকা। যেভাবে প্রচণ্ড ঝড় শুরুর পূর্বে কালো মেঘে ঢেকে যায় সূর্য, দমকা হাওয়া সহসাই পথ হারায় কোন প্রান্তরে, থমথমে শীতল অনুভূতি ছড়ায় ক্ষণিকের জন্য। কেবল কিছু শুকনো পাতা আর মিহি বালি ভাসে বাতাসে, সাথে ভাসে একটা হাহাকার ভরা উৎকণ্ঠার পূর্বাভাসের গন্ধ।
আচমকাই যেন খটখটে বাস্তবে আছড়ে পড়লাম, জেরিনের দেয়া শর্তটা মনে পড়লো আমার । তার পুরুষ ছিল, সে একজনকে ভালোবাসতো, আর তাকেও ভালোবাসতো একজন। ভালোবাসার তার অভাব ছিল না, তার দরকার ছিল প্রেম, সে আমার কাছে এসেছিল প্রেমের জন্য । আমি তাকে প্রেমের সব আনন্দই দিয়েছিলাম । কিন্তু আমাকে ভালোবাসার কেউ ছিল না । জেরিন আমাকে প্রেম দিয়েছিল, ভালোবাসাও হয়তো কিছু কিছু । আমি কেন তাকে ছেড়ে দিবো, আমারও ভালোবাসা দরকার, একইসাথে প্রেমও । আমি কোনভাবেই নিজের আনন্দকে বিসর্জন দিতে পারি না ।
আমি জেরিনকে আমার ভালোবাসার কথা বললাম । সে আইনত আমার স্ত্রী, আমার অপারগতা তাকে জানালাম আমি ।জেরিন কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে ছিল নিস্পলক পাথরের মূর্তির মতো, এরপর আচমকাই নিঃশব্দে জ্ঞান হারালো ।

অনেক বছর পর যখন জেল থেকে বেরুলাম আমি, সব কিছুই পাল্টে গেছে ততদিনে। জেরিন প্রবাসী এক ছেলেকে বিয়ে করে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছে। আমার সব সহপাঠী বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাগ নিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি যেই পুরনো একতলা বাড়িটার চিলেকোঠায় থাকতাম সেটা ভেঙে বহুতল ভবন হয়েছে। জেরিনের সেই প্রভাবশালী ভাইটা স্ট্রোকে মারা গেছে, যে মিথ্যা মামলায় আমার বহু বছর জেলে থাকার বন্দোবস্ত করেছিল। অথচ আমি কেবল ভালবেসেছিলাম, আর কিছুই না।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।